চট্টগ্রামের আলোচিত প্রতিষ্ঠান অগাস্টিন পিউরিফিকেশনকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ উঠেছে—দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা গুরুতর অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না করে বরং তা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যদিকে। এমনকি অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, প্রকৃত তদন্তের বদলে এমন এক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে যেখানে অভিযুক্তদের বদলে অভিযোগকারীই হয়ে উঠছেন তদন্তের লক্ষ্যবস্তু। এ ঘটনায় নতুন করে পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়ে সমবায় অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ে আবেদন করেছেন অমূল্য লরেন্স পেরেরা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অগাস্টিন পিউরিফিকেশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আসছেন।
দুদকের অভিযোগ, কিন্তু তদন্তে সমবায় অফিস : অমূল্য লরেন্স পেরেরার অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি অগাস্টিন পিউরিফিকেশন–এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি দুদকে দাখিল করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সমবায় অধিদপ্তর থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি পত্র জারি করা হয়, যেখানে দুদকের নির্দেশনার উল্লেখ থাকলেও তদন্তের ধরন ও লক্ষ্য নিয়ে দেখা দেয় বড় ধরনের প্রশ্ন।
অভিযোগকারী বলছেন— তদন্তের নামে মূল অভিযোগের পরিবর্তে দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড–কে কেন্দ্র করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা মূল অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।
অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে তদন্ত আয়োজন? অমূল্য লরেন্স পেরেরার দাবি, সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা—বিশেষ করে বিভাগীয় সমবায় কার্যালয় ঢাকার উপ-নিবন্ধক (বিচার) মো. মিজানুর রহমান, যিনি যাচাই দলের দলনেতা—তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন আচরণ করেছেন, যাতে মনে হচ্ছে তদন্তটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নয়, বরং অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই পরিচালিত হচ্ছে।
তার অভিযোগ, দুদকের নির্দেশনার প্রকৃত কপি বা অনুমোদনের তথ্য তাকে কখনো দেখানো হয়নি। অথচ তার অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কোথায় সেই দুদকের নির্দেশনা ? অভিযোগকারী জানতে চেয়েছেন— দুদক ঠিক কোন তারিখে ও কোন স্মারকে অগাস্টিন পিউরিফিকেশনের বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমোদন দিয়েছে ? সেই নির্দেশনা কেন অভিযোগকারীকে জানানো হয়নি? কেন দুদককে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেয়ে তিনি সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও নিবন্ধকের কাছে পুনঃতদন্তের আবেদন করেছেন।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ থাকার দাবি : অভিযোগকারীর দাবি, তার অভিযোগ শুধু মৌখিক নয়—বরং দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড–এর বার্ষিক অডিট প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের লিখিত প্রমাণ রয়েছে। তিনি বলেছেন, বিভিন্ন বছরের অডিট রিপোর্টে অনিয়মের তথ্য উল্লেখ আছে, সেইসব প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট স্বারক, তারিখ ও পৃষ্ঠাসংখ্যা সংযুক্ত করা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে দেশের অন্তত অর্ধশতাধিক সংবাদপত্রে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে হাজিরা দিতে না পারার ঘটনাও বিতর্কে গত ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে উচ্চ আদালতে মামলার কারণে তিনি তদন্ত সংক্রান্ত একটি শুনানিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বিষয়টি আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের—মো. শাকিলুজ্জামান ও আমিনুল—অবহিত করেছিলেন। কিন্তু তারপরও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অনুলিপি : অমূল্য লরেন্স পেরেরা তার আবেদনপত্রের অনুলিপি পাঠিয়েছেন— প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সমবায় অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়।
প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে- ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন— দুদকের অভিযোগ থাকলে তদন্ত অন্য খাতে ঘুরল কেন ? তদন্তে স্বচ্ছতা না থাকলে কি আসল সত্য চাপা পড়ছে? আর অভিযোগকারীকেই যদি তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবে কে ?
অনুসন্ধান দাবি বিশেষজ্ঞদের- দুর্নীতি ও সমবায় খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। তাদের মতে, যদি সত্যিই অডিট রিপোর্টে অনিয়মের প্রমাণ থাকে, তাহলে সেটি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। আর তদন্ত প্রক্রিয়াই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়।
এই বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তর, তদন্ত দলের সদস্য এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
