বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কিন্তু নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে জটিল। এর সঙ্গে দলের নিবন্ধনের মতো বিষয় রয়েছে। তবে ভোটার উপস্থিতি প্রভাব ফেললে বিষয়টি আমলে নেওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইওএম) প্রধান ইয়র ইয়াবস। রোববার সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
দুপুরে ঢাকার একটি হোটেলে সংবাদ সম্মলনে ইইউ ইওএম মিশন প্রধান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। উপ-মিশন প্রধান ইন্তা লাসেসহ পর্যবেক্ষক দলের অন্য সদস্য এবং ইইউ, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এতে উপস্থিত ছিলেন।
শুরুতে ইয়র ইয়াবস বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক হবে, এটি সবার প্রত্যাশা। তাছাড়া, শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজন ভোটারদের মাঝে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা তৈরি করে।’
প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সাংবাদিক জানতে চান, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন কি বুঝায়? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রেক্ষাপট থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থ হচ্ছে– বাংলাদেশের সব সামাজিক দলের অন্তর্ভুক্তি, যেমন– নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আঞ্চলিক দল। অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা বুঝিয়েছি– বিশ্বাসযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি। এটি এই বার্তা দেবে যে, বাংলাদেশিরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে নিজের ভবিষ্যতের জন্য।’
অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে বিগত সময়ে ইউরোপের রাষ্ট্রদূতরা অবশ্য সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণকে বুঝান। তাহলে, ইইউ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলকের ব্যাখ্যা কি পরিবর্তন করেছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বলতে সবকিছু বুঝিয়েছি, নাগরিকদের ভোট দিতে পারা এবং গণনার স্বচ্ছতাও এরমধ্যে রয়েছে। অংশগ্রহণমূলকের মধ্যে দলের নিবন্ধনও একটি বিষয়। আমরা জানি, বিষয়টি বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে জটিল বিষয়। বিশেষ করে এরমধ্যে জাতীয় রিকনসিলিয়েশন বা সমঝোতা ও অন্তর্বর্তীকালীন বিচারের মতো বিষয় রয়েছে এরমধ্যে।
ইয়র ইয়াবস বলেন, আমরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবো না। নির্বাচনের ভোটার উপস্থিতিতে যদি এটি প্রভাব ফেলে, তবে আমরা এ বিষয়টি আমরা আমলে নেব। আমরা এখানে নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্তব্য করতে আসিনি, আমরা বিষয়টি নিয়ে অবগত এবং নজরে রেখেছি।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দুটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বাকিদের সঙ্গে বৈঠকের প্রক্রিয়া চলমান। প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো সহিংসতামুক্ত একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য নিবেদিত।
নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন করলে মিশন প্রধান বলেন, এটি একটি সমস্যার বিষয়। আমি আশা ও প্রত্যাশা করি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত বাহিনী রয়েছে এটি মোকাবিলার।
রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনায় কি ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে এবং তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিষয়ে কতটুকু আশ্বস্থ- জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রতি নিবেদিত। সামনে কি হয়, তা আমরা পর্যবেক্ষণ করবো। কারণ ২০০৮ এরপর বাংলাদেশে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সক্ষমতা নিয়ে জানতে চাইলে ইয়র ইয়াবস বলেন, ইসির স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ততার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ধারণা হয়েছে। তবে আমরা আইনি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণে রাখবো। আমরা এখানে কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতা পর্যবেক্ষণে এসেছি।
আগামী নির্বাচনের প্রধান চ্যালেঞ্জ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নাগরিকদের আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জন করা। এ চ্যালেঞ্জটি আমার দেশ, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশের চ্যালেঞ্জ।
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে প্রশ্ন করলে ইয়র ইয়াবস বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয়টি অনেকভাবে খতিয়ে দেখা হবে, যেমন– দলগুলোকে গণমাধ্যমে যেতে দেওয়ার সুযোগ। এছাড়া প্রার্থীদের আপিল করার সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয় এখানে রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ অনেক দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি চ্যালেঞ্জ। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমাদের প্রাথমিক ধারণা হচ্ছে– তারা ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন। এখানে সবচেয়ে কঠিন বিষয় হচ্ছে ভারসাম্য রক্ষা করা। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি অবাধে সমাবেশ করতে দেওয়ার অধিকারকে রক্ষা করা। এ ভারসাম্যটি কীভাবে রক্ষা করে, সেটি আমরা পর্যবেক্ষণ করবো।
অবাধ ও মুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ কি বাংলাদেশে রয়েছে- জানতে চাইলে ইয়র ইয়াবস বলেন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সক্ষম। এ কারণেই ইইউ বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এসেছে।
নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, দুটি বিষয়ে একসঙ্গে ভোট সাধারণত হয় না। তবে আমাদের দেশ লাটভিয়ায় হয়েছে। তবে আমরা মূলত সংসদ নির্বাচন পর্যেবক্ষণ করবো। গণভোটটি আমাদের ম্যান্ডেটের বাইরে। যেহেতু দুটি বিষয় একত্রে জড়িত, ফলে সেটিও দেখা হবে।
এয়ারবাস ক্রয় না করার বিষয়টি কি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলবে? উত্তরে ইইউ ইওএমের মিশন প্রধান বলেন, আমি এখানে যে ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছি, তা আমাকে এখানকার রাষ্ট্রদূতরা বা ইইউর এক্টার্নাল সার্ভিস দেননি। আমার কাজ হচ্ছে এখানে ন্যয়নিষ্ট, বস্তুনিষ্ট ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ দেওয়া। পাশাপাশি কারও কথায় প্রভাবিত না হওয়া।
নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণে আমাদের একটি বিশেষ দল রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনগুলো ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই শান্তিপূর্ণভাবে, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।নির্বাচনগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
তিনি জানান, নির্বাচনের দুই দিন পর, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ইইউইওএম একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে এবং ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করবে। প্রায় দুই মাস পর একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইইউ ইওএমের সকল পর্যবেক্ষক কঠোর আচরণবিধির অধীন এবং মিশনটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নীতিমালার ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ পরিচালনা করেন।
বাংলাদেশে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পর্যবেক্ষণ মিশন শুরু করেছে। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে এই মিশন- স্বাধীনভাবে, কোন রকম পক্ষপাতিত্বহীনতা ছাড়া ও কোন রকম হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে––তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
পূর্ণ সক্ষমতায় এই মিশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সকল ২৭টি সদস্য দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ১১ জন বিশ্লেষক নিয়ে একটি কোর টিম, ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক, যাদের ভোটের ঠিক আগে মোতায়েন করা হবে, এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ও অংশীদার দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনের পর্যবেক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধি দল এই মিশনে যোগ দিয়ে এর কার্যক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে।
প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারিত্বের গুরুত্বকে পুনরায় নিশ্চিত করে।
মিশনটি তাদের কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও তার বাস্তবায়ন, নির্বাচনী প্রচারণা এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যে নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। এছাড়াও নারী, তরুণ প্রজন্ম ও ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য জনগোষ্ঠীসহ সকলের রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের সামগ্রিক পরিসর মূল্যায়ন করা হবে। ভোটারদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য ইইউ ইওএমের পৃথক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ইইউ ইওএম নির্বাচনগুলো জাতীয় আইন অনুযায়ী কতটা পরিচালিত হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানদণ্ড গ্রহণ করেছে, সেগুলোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা মূল্যায়ন করবে।
