স্ত্রী ও ২ সন্তানের সঙ্গে পিন্টুর এই ছবি এখন স্মৃতি
ঈদের আনন্দ, নতুন জামা আর নানার বাড়ি যাওয়ার উচ্ছ্বাস—সবকিছুই যেন মুহূর্তে থেমে গেল। শনিবার গভীর রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেল লেভেল ক্রসিংয়ে ঘটে গেল এক বিভীষিকাময় দুর্ঘটনা। হাসিমুখে যাত্রা শুরু করা ১২টি প্রাণ নিভে গেল নির্মম ট্র্যাজেডিতে, রেখে গেল অশ্রু আর বুকভাঙা আর্তনাদ।
রোববার দুপুর থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে একে একে জড়ো হতে থাকেন স্বজনরা। প্রিয়জনের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। হাসপাতালজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শোকের ভারী বাতাস—যেন প্রতিটি দেয়াল সাক্ষী একেকটি ভাঙা হৃদয়ের।
যশোর থেকে আসা পিন্টু ইসলামের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার। নিজের হাতে শনাক্ত করলেন স্ত্রী লাইজু আক্তার (২৬) ও দুই আদরের মেয়ে—খাদিজা (৬) আর মরিয়মের (৩) নিথর দেহ। অথচ কিছুক্ষণ আগেও তারা ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের কারণ। স্ত্রী-সন্তানদের নোয়াখালীর শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে নিজে ঢাকায় নেমেছিলেন তিনি। রাত ১২টায় মেয়েদের সঙ্গে ছিল শেষ কথা—তারপরই আসে সেই দুঃসংবাদ।

লাশ নিতে মর্গের সামনে স্বজনরা
কান্নাজড়িত কণ্ঠে পিন্টুর আর্তনাদ, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব? ঈদের খুশিতে ওরা নানাবাড়ি যাচ্ছিল… আর কোনোদিন দেখা হবে না—এটা আমি মানতে পারছি না… অন্যদিকে, লাশঘরের সামনে বুকের সঙ্গে দেড় বছরের শিশু মরিয়মকে আঁকড়ে ধরে নির্বাক কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমি আক্তার। হারিয়েছেন স্বামী জুহাদ বিশ্বাসকে। ঈদের দিন রাতে ঝিনাইদহ থেকে ছুটে এসেছিলেন পরিবারে ফেরার আশায়—কিন্তু আর ফেরা হলো না।
রুমির কণ্ঠে নিঃস্বতার হাহাকার, আমার আর মেয়ের তো পৃথিবীতে কেউ রইল না… হিমঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে ভেঙে পড়েন সাহিদা সুলতানা। ভাতিজি সাঈয়্যেদার লাশ নিতে এসে জানান—এই দুর্ঘটনায় শুধু সাঈয়্যেদাই নয়, গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন তার মা-বাবাও। মেয়েটা তো চলে গেছে… এখন ওর মা-বাবাও বাঁচবে কি না জানি না…—কথাগুলো বলতে বলতেই আহাজারিতে ভেঙে পড়েন তিনি। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. শাহজাহান জানান, নিহত ১২ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
একটি রাত, একটি মুহূর্ত—আর তাতেই বদলে গেল বহু পরিবারের জীবনের গল্প। ঈদের আনন্দ যেখানে হওয়ার কথা ছিল ভালোবাসা আর মিলনের, সেখানে আজ কেবল শোক, কান্না আর না ফেরার দেশের দীর্ঘশ্বাস… আর অব্যক্ত কান্না শিশু মরিয়মের। এখানে পিন্টু লাইজির লাইজুর দাম্পত্য জুটি নয় হাজারো মানুষের হৃদয়ের গভীরে এক অদৃশ্য হাহাকার। পরিবারের নিঃশব্দ প্রবোধ ধুঁকে ধুঁকে অসহনীয় স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা।
