জাতীয় প্রেসক্লাবে ইচআরএসএসের সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ছবি-সংগৃহীত
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত গত ১৭ মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৯৫ জন নিহত এবং ১১ হাজার ২২৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা বা গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২৫৯ জন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি ও প্রাক-নির্বাচনী সহিংসতা’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ১৫টি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে সারাদেশে ১ হাজার ৪১১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধ, দলীয় কমিটি নিয়ে বিরোধ এবং চাঁদাবাজিকে এসব সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত ১৯৫ জনের মধ্যে বিএনপির ১৩৪ জন এবং নিষিদ্ধ কার্যক্রমে জড়িত আওয়ামী লীগের ২৬ জন রয়েছেন। এছাড়া জামায়াতের ৫ জন, ইউপিডিএফের ৬ জন, চরমপন্থি দলের ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের ১ জন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১ জন নিহত হয়েছেন। বাকি ১৯ জনের রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২২৯টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনায় ৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪০৩ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৩৪৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ২৯ হাজার ৭৭২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৬৫ হাজারের বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
বিভিন্ন মামলায় ও যৌথবাহিনীর অভিযানে ৫৫ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মব জাস্টিস বা গণপিটুনির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৭ মাসে ৪১৩টি গণপিটুনির ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে এসব ঘটনা ঘটেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি মব সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দেন।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “মব ভায়োলেন্স এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অফিসে হামলা চালানো হয়েছে।”
প্রতিবেদনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, এই সময়ে ৮৩৪ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন নিহত, ৩৭৯ জন আহত এবং ৩৩ জন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৪১টি মামলায় ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত ও সংঘর্ষে ৬০ জন নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে ২২ জন নির্যাতনে এবং ২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। পাশাপাশি কারাগারে অসুস্থতা ও নির্যাতনে ১২৭ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮৩ জন ছিলেন হাজতি।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এ সময়ে ২ হাজার ৬১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ১৬ জন ধর্ষণের শিকার, এবং ধর্ষণের পর ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪৪ জন, আর শিশু নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪৭৮ জন শিশু।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে। বিএসএফের গুলিতে ৪৩ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ১৮৬ জনকে ধরে নিয়ে গেছে বিএসএফ। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির হামলায় ৩ জন নিহত হয়েছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ১ জন নিহত ও ২৭ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়। এছাড়া সারাদেশে শতাধিক মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ৫৩১টি ঘটনায় ১৬৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২৫৮ জন শ্রমিক।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে মনিরুজ্জামানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
