শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ: সওজ প্রকৌশলী নাজমুলের দিকে তদন্তের তীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ২৩, ২০২৬ ২:০৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর টোল আদায়ে ৫৩ কোটি টাকার হিসাবের গরমিল, খাস কালেকশনের নামে রাজস্ব তসরুপের অভিযোগ। ফাইল ছবি

বরিশাল: দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই সেতু—ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বাবুগঞ্জে সুগন্ধা নদীর ওপর নির্মিত ৩৯০ মিটার দীর্ঘ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর (দোয়ারিকা) সেতু এবং উজিরপুরে সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ মেজর এম এ জলিল (শিকারপুর) সেতুতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় বা ‘খাস কালেকশন’ নিয়ে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলাম।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুই সেতু থেকে আনুমানিক ৯৫ কোটি টাকা টোল আদায় হয়েছে। অথচ সরকারি কোষাগারে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র প্রায় ৪২ কোটি টাকা। আদায় ও জমার হিসাবের মধ্যে প্রায় ৫৩ কোটি টাকার বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের রাজস্ব কোথায় গেল, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সরকারি নথিতে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

প্রতিদিন সংগৃহীত প্রকৃত টোলের বিপরীতে নামমাত্র রাজস্ব চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেখানো হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। এতে নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও হস্তক্ষেপ ছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া দায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

পদ্মা সেতু চালুর পর বেড়েছে টোল, ইজারার অঙ্কও কয়েক গুণ

সওজ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় তিন বছরের জন্য দুই সেতুর টোল আদায়ের ইজারা দেওয়া হয়েছিল।

২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুতে যানবাহন চলাচল কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে দৈনিক টোল আদায় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

আগের ইজারার মেয়াদ শেষ হলে সওজ কর্তৃপক্ষ তিন বছরের জন্য ১০১ কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে ‘চাঁদনী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস’কে নতুন ইজারাদার হিসেবে প্রাথমিক অনুমোদন দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী প্রথম কিস্তির অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে সওজ কর্তৃপক্ষ তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করে।

এরপর নতুন করে দ্রুত ইজারা চুক্তি সম্পাদন না করে সওজ সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ‘খাস কালেকশন’ বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় টোল আদায় শুরু করে। অভিযোগ উঠেছে, এই ব্যবস্থাপনার আড়ালেই রাজস্ব আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমার হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি তৈরি হয়েছে।

প্রতিদিন আদায় ১৩ লাখ, জমা দেখানো ৫ লাখ ৭৬ হাজার!

প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত খাস কালেকশন চলাকালে প্রতিদিন গড়ে ১৩ লাখ টাকারও বেশি টোল আদায় হয়েছে। কিন্তু সরকারি কোষাগারে প্রতিদিন গড়ে জমা দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

এই হিসাব অনুযায়ী, দুই সেতু থেকে মোট টোল আদায় প্রায় ৯৫ কোটি টাকা হলেও সরকারি জমা প্রায় ৪২ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ৫৩ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি বা অপ্রদর্শিত অর্থের হিসাব সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আদায় ও জমার এই বিশাল ব্যবধানের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ হিসাব নিরীক্ষা অপরিহার্য। দুই সেতুর প্রতিদিনের টোল টিকিটের কাউন্টারফয়েল, ক্যাশ রেজিস্টার, যানবাহন চলাচলের তথ্য, টোল আদায়ের রেকর্ড এবং ব্যাংকে জমা দেওয়া চালান পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত আর্থিক চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তবে ৯৫ কোটি টাকা আদায় ও ৪২ কোটি টাকা জমার হিসাবের ভিত্তি, সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি এবং রাজস্বের প্রকৃত ঘাটতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

৮৫ কোটি টাকার ইজারা প্রস্তাব, খাস কালেকশনে সম্ভাব্য আয় ৬৩ কোটি

এই অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে সওজের অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্রে।

২০২৬ সালের ১২ মার্চ নবম আহ্বানে সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তিন বছরের জন্য ৮৫ কোটি টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা ‘আতিক কনস্ট্রাকশন’-কে ইজারা অনুমোদনের সুপারিশ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই সুপারিশপত্রে বলা হয়, খাস কালেকশন অব্যাহত থাকলে তিন বছরে সরকারের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ রাজস্ব হতে পারে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, আতিক কনস্ট্রাকশনের প্রস্তাবিত ইজারামূল্য ছিল ৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রস্তাবিত ইজারামূল্য খাস কালেকশনের সম্ভাব্য আয়ের চেয়ে ২২ কোটি টাকা বা প্রায় ৩৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি।

এ অবস্থায় বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন সময়মতো নতুন ইজারা কার্যকর করা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে খাস কালেকশন দীর্ঘায়িত হয়েছিল কি না, কিংবা এই ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব আদায় ও জমার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম ঘটেছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে তদন্তের দাবি

আইন বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ বা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইনে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারার প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা যেতে পারে। তবে অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ ও আইনের প্রযোজ্যতা নির্ধারণের পরই সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা বা শাস্তির বিষয়টি বিবেচিত হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগের নথি, টোল আদায়ের হিসাব, সরকারি চালান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করে আইনানুগ অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

কোটি মানুষের যোগাযোগের সেতু, রাজস্বের হিসাব কোথায়?

প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এবং ২০০৩ সালে উদ্বোধন হওয়া দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতু দক্ষিণাঞ্চলের কোটি মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এসব সেতুর টোল থেকে আদায় করা সরকারি রাজস্বের হিসাব নিয়ে এমন অভিযোগ স্থানীয় নাগরিক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের দাবি, সেতু দুটির টোল আদায় ও সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার পুরো হিসাব প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রাজস্ব আদায়, জমা এবং সম্ভাব্য ঘাটতির কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

৫৩ কোটি টাকার হিসাবের গরমিলের অভিযোগের নিষ্পত্তি এখন নির্ভর করছে নিরপেক্ষ নিরীক্ষা, সরকারি নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ওপর।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত থাকবে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে….…

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।