বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঘুষ-হয়রানির অভিযোগের পরও বহাল তবিয়তে রাজউকের অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস

স্টাফ রিপোর্টার
অক্টোবর ২১, ২০২৬ ১:২৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ছুটি মঞ্জুরের আগেই বিদেশযাত্রা, নকশা অনুমোদনে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ; সতর্ক করেই দায় শেষ, দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য। প্রতীকী ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, দুর্ব্যবহার ও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চাহিদামতো ঘুষ কিংবা সার্ভিস চার্জ না দিলে ফাইলের অগ্রগতি থমকে যায়। এমনকি পেশাগত পরিচয় দিয়ে বৈধ সেবা দ্রুত পাওয়ার চেষ্টা করলেও উল্টো হয়রানির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ।

ছুটি মঞ্জুর হওয়ার আগেই বিদেশে চলে যাওয়া, কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতি এবং এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলার মতো বিষয়ও রয়েছে তার চাকরিজীবনের আলোচিত অধ্যায়ে। তবে এসব ঘটনায় কঠোর শাস্তির পরিবর্তে সতর্ক করেই কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব শেষ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অন্যদিকে, নকশাসংক্রান্ত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাসে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিন দফায় ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ওই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইলিয়াস অবশ্য ঘুষ, দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ ওঠার পরও দায়িত্বে বহাল থাকায় রাজউকের জবাবদিহি ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা গেলেও কার্যকর প্রতিকার মেলে না। ফলে ভোগান্তি কমার বদলে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈধ সেবা চাইতে গিয়েও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের সাবেক এক অতিরিক্ত সচিব সমতল মাতৃভূমি’র কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চাকরিজীবনে তিনি এতটা বেপরোয়া কর্মকর্তা দেখেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইলিয়াসের চাকরির বয়স মাত্র সাত-আট বছর হলেও তার আচরণে এমন ভাব প্রকাশ পায়, যেন তিনি কাউকেই পরোয়া করেন না।

ওই সাবেক কর্মকর্তা জানান, একটি বৈধ কাজের কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে বিলম্ব হওয়ায় তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার অনুরোধ জানাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরিচয় দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং তার অভিযোগ অনুযায়ী, হয়রানির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস তার সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন এবং সেবাসংক্রান্ত আলোচনার সময় তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়।

প্রশাসন ক্যাডারের সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে এমন আচরণ মেনে নিতে পারছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছেন। তবে বিব্রতকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় কোথাও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি।

তার বক্তব্য, অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কিছুটা শাস্তি হলেও সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি দূর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, যাদের নিয়মিতভাবে এসব কর্মকর্তার কাছ থেকে সেবা নিতে হয়, তাদের দুর্ভোগের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নকশার কাজ করে দেওয়ার আশ্বাসে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ

ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে শুধু দুর্ব্যবহার নয়, ভবনের নকশাসংক্রান্ত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, নকশাসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে তিন কিস্তিতে মোট ১০ লাখ টাকা নেন ইলিয়াস।

ওই ব্যবসায়ীর দাবি, টাকা দেওয়ার পরও তিনি প্রতিশ্রুত কাজ পাননি। পরে যোগাযোগের চেষ্টা করলে লোকজনের মাধ্যমে তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইলিয়াস জানিয়েছিলেন, ওই ব্যক্তিকে তিনি চেনেন না। ফলে অর্থ লেনদেন, কাজের প্রতিশ্রুতি এবং হুমকির অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা প্রয়োজন।

ছুটি মঞ্জুরের আগেই মালয়েশিয়া, পরে বিভাগীয় মামলা

রাজউকের এই কর্মকর্তার বিদেশযাত্রা নিয়েও অতীতে প্রশ্ন উঠেছিল। জানা যায়, ২০১৮ সালের আগস্টে মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করার জন্য তিন বছরের বহিঃবাংলাদেশ ছুটির আবেদন করেন ইলিয়াস হোসেন। কিন্তু ছুটি মঞ্জুর হওয়ার আগেই তিনি মালয়েশিয়ায় চলে যান।

এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দুই মাস দুই দিন কর্মস্থলে অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়।

এ প্রসঙ্গে ইলিয়াসের বক্তব্য, ছুটির আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় বিমানের টিকিটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন। তদন্তের পর তাকে সতর্ক করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে সরকারি চাকরিতে ছুটি মঞ্জুরের আগে বিদেশযাত্রা এবং কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতির মতো ঘটনায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপ যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য

সূত্রের দাবি, ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। তবে অনুসন্ধানের বর্তমান অগ্রগতি, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট পরিধি কিংবা এ বিষয়ে কমিশনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তবে অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ অস্বীকার ইলিয়াসের

অভিযোগের বিষয়ে মো. ইলিয়াস হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ছুটির আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় বিমানের টিকিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে বিদেশে যেতে হয়েছিল। ওই ঘটনায় তদন্তের পর তাকে সতর্ক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

পুরোনো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনার কোনো অর্থ খুঁজে পান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপর থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে ইলিয়াসের দাবি, তিনি কারও কাছ থেকে ঘুষ নেন না এবং দুর্নীতি কিংবা দুর্ব্যবহারও করেন না।

জোন পরিবর্তন, অভিযোগের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

রাজউকের এই কর্মকর্তা বর্তমানে জোন-৭/১-এর অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি রাজউকের জোন-৫/২-এর অথরাইজড অফিসার এবং জোন-৬-এর সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

একাধিক অভিযোগ, বিভাগীয় মামলা এবং সতর্ক করার তথ্য সামনে আসার পরও তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর উন্নয়ন সংস্থায় নকশা অনুমোদন ও ভবন নির্মাণসংক্রান্ত সেবা দিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ-হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জনআস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তদন্তের ফল কী এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন।

জোন-৬-এ দায়িত্ব পালনকালে ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।