সিসিটিভি ফুটেজে কর্মকর্তার উদ্ধত আচরণ, অসুস্থ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা। সুমি আক্তার। ফাইল ছবি
ঢাকার আশুলিয়ায় একটি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আর ঘরে ফেরা হলো না সুমি আক্তার মিশুর। স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানোর তাগিদে প্রতিদিনের মতো সেদিনও সুইং মেশিনের সামনে বসেছিলেন তিনি। কিন্তু কর্মব্যস্ত সেই ফ্লোরেই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ঘটে গেল মর্মান্তিক ঘটনা। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্যে দেখা গেছে, কাজের সময় এক কর্মকর্তার দুর্ব্যবহার ও উদ্ধত আচরণের পরপরই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন সুমি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
গত ১৬ অক্টোবর ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে এ ঘটনা ঘটে। অসুস্থ বোধ করায় সুমি কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটি চেয়েও পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও উৎপাদনের চাপের কারণে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।
নিহত সুমি আক্তার মিশুর গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায়। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাঁর জীবনসংগ্রামের পরিণতি যে এমন করুণ হবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
সিসিটিভিতে ধরা পড়ল শেষ মুহূর্তের দৃশ্য
প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সুমি সুইং মেশিনে বসে কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর পাশে আসেন এক ব্যক্তি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে আরেক ব্যক্তি সুমির দিকে তেড়ে যান। তিনি সুইং মেশিন চাপড়াতে থাকেন এবং কয়েক দফায় উদ্ধত অঙ্গভঙ্গি করেন। সুমি যে কাপড় নিয়ে কাজ করছিলেন, সেটিও তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিচে ফেলে দেন ওই ব্যক্তি।
ফুটেজে দেখা যাওয়া এসব আচরণের একপর্যায়ে সুমি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। দৃশ্যটি যেন মুহূর্তেই বদলে দেয় কারখানার কর্মচাঞ্চল্য। যে নারী কিছুক্ষণ আগেও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য মেশিনে কাজ করছিলেন, তাঁকেই পড়ে থাকতে দেখা যায় ফ্লোরে।
সিসিটিভির সময় অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে সুইং মেশিনে কাজ করার সময় মেঝেতে পড়ে যান সুমি। এ সময় মেশিন চাপড়ানো ও উদ্ধত অঙ্গভঙ্গি করা ব্যক্তিকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
এরপর এক নারী শ্রমিক এসে সুমিকে তোলার চেষ্টা করেন। আশপাশের আরও কয়েকজন নারী শ্রমিক এগিয়ে আসেন। ফুটেজে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি সুমির মাথার কাছ থেকে কিছু একটা দূরে ছুড়ে ফেলে ঘটনাটি দেখতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে চলে যান। অন্যদিকে, সহকর্মীরা সুমিকে ওঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।
বিকেল ৫টা ৩ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে একটি স্ট্রেচার নিয়ে ফিরে আসেন কয়েকজন শ্রমিক। পরে সুমিকে স্ট্রেচারে করে ফ্লোরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্মস্থলের সেই কয়েক মিনিটের দৃশ্য এখন তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
‘এটা এক ধরনের নির্যাতন, আমি বিচার চাই’
সুমির মৃত্যুর খবর পেয়ে কারখানায় ছুটে যান তাঁর স্বামী সাজ্জাদ হোসেন। প্রিয় মানুষটির এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার দিন দুপুরে বিরতির সময় সুমি বাসায় এসে খাবার খেয়ে আবার কর্মস্থলে ফিরে যান।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ঘটনার দিন দুপুরে বিরতির সময় সুমি বাসায় খেতে আসে। খাওয়া শেষে আবার অফিসে যায়। আমি এ সময় বাসায়ই ছিলাম। সে অসুস্থ ছিল না। অসুস্থ বললে তো অফিসেই যেতে দিতাম না।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ফুটেজে যা দেখা গেছে, এটা এক ধরনের নির্যাতন। শরীরে হাত তোলা ব্যতীত যা বলার, করার সব করেছে। খবর পেয়ে ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলাম। পরে তাকে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আমি বিচার চাই।
একজন শ্রমজীবী নারীর মৃত্যুর পর এখন তাঁর পরিবারের সামনে শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যে সংসার সামলাতেন সুমি, তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই সংসারের বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সুপারভাইজার সাময়িক বরখাস্ত
ঘটনার পর সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ফ্লোরের লাইন সুপারভাইজারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ডেকো গ্রুপের জিএম (অ্যাডমিন, এইচআর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) সালাউদ্দিন বলেন, ‘ইতোমধ্যে ওই সুপারভাইজারকে শোকজ ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুমির পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সুমির সহকর্মীদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছেন, স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত থাকতেন সুমি। স্বামী কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় তিনি হয়তো স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তায় ছিলেন। মৃত্যুর ঘটনায় মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও তিনি শুনেছেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সুমির পরিবারকে যৌক্তিক সব বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
মামলা হয়েছে, তদন্তে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের অপেক্ষা
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য সুমির মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তবে এখনো কেউ গ্রেপ্তার হননি।
সুমির মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে রয়েছে সিসিটিভি ফুটেজে দৃশ্যমান আচরণ, অন্যদিকে রয়েছে অসুস্থ অবস্থায় ছুটি না পাওয়ার অভিযোগ। এসব বিষয় তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একটি পরিবারের ভরসা ছিলেন সুমি। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে প্রতিদিন মেশিনের সামনে বসতেন তিনি। সেই কর্মস্থলেই তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কাটল সহকর্মীদের চোখের সামনে। এখন তাঁর পরিবারের প্রত্যাশা—মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত হোক, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং দায়ী ব্যক্তিরা প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারের মুখোমুখি হোন।
