জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে পটুয়াখালীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘পটুয়াখালীতে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন এবং জলবায়ু সহনশীলতা’ (Locally Led Adaptation and Climate Resilience in Patuakhali) শীর্ষক দিনব্যাপী অংশীজন পরামর্শ সভা (Stakeholder Consultation Meeting)।
রোববার (৬ জুলাই) আয়োজিত এ সভার যৌথ আয়োজন করে পরিবেশবাদী সংগঠন লাল সবুজ সোসাইটি (LSS) এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (IUB)-এর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD)।
সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, পরিবেশকর্মী, তৃণমূলের যুব ও নারী প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। দিনব্যাপী আয়োজিত এ পরামর্শ সভায় স্থানীয় বাস্তবতা, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব এবং Locally Led Adaptation (LLA) কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি ও বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস-এর ডিন ও সহযোগী অধ্যাপক ড. কে. আয়াজ রব্বানী। এছাড়া ICCCAD-এর COLOCAL Project-এর রিসার্চ অফিসার ফাহমিদ মহতাসিন, লাল সবুজ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আল মামুন রাকিব এবং প্রজেক্ট ম্যানেজার মোমেনা শিফা রুমকি বিভিন্ন সেশন পরিচালনা করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করেন।
আলোচনায় পটুয়াখালীর কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব এবং এসব খাতকে আরও সহনশীল করে গড়ে তোলার সম্ভাব্য কৌশল গুরুত্ব পায়।
আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত পটুয়াখালী সদর উপজেলার কৃষি অফিসার মো. নাজমুল ইসলাম মজুমদার জেলার কৃষি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকা লবণাক্ততার প্রভাব এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মৎস্য খাত নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন মোহাম্মদ মতিউর রহমান, মৎস্য প্রশিক্ষক, পটুয়াখালী যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয়। তিনি যুব সমাজকে পরিবেশবান্ধব মৎস্য চাষে সম্পৃক্ত করে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি, টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় মৎস্য খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান প্রাণিসম্পদ খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, খামার ব্যবস্থাপনায় উদ্ভূত সমস্যা এবং খামারিদের সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। একইসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনমূলক উদ্যোগ আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে লাল সবুজ সোসাইটি (LSS) পটুয়াখালী অঞ্চলের তৃণমূল মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা, চাহিদা ও সমস্যার ভিত্তিতে প্রস্তুত ‘চাহিদা নিরূপণ’ (Needs Assessment) প্রতিবেদনের মূল তথ্য বাংলায় উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্য, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক বাস্তবতায় সৃষ্ট বহুমাত্রিক প্রভাব তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অভিযোজন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের মতামত ও প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এরপর জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সংগ্রামরত উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত বিশেষ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ‘সুমাইয়ার যাত্রা’ (Sumaiya’s Journey) প্রদর্শন করা হয়। চলচ্চিত্রটি উপস্থিত অতিথি, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে। প্রদর্শনের পর উন্মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময় পর্বে অংশগ্রহণকারীরা চলচ্চিত্রে তুলে ধরা বাস্তবতার সঙ্গে উপকূলীয় জনগণের অভিজ্ঞতার মিল তুলে ধরে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্থানীয় যুব ও নারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি উন্মুক্ত সংলাপ। এতে কৃষি, মৎস্য, উপকূলীয় নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সামাজিক সংকট এবং প্রতিদিনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেন।
আলোচনায় সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং Locally Led Adaptation (LLA) কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই কার্যকর জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব।
সমাপনী বক্তব্যে ড. কে. আয়াজ রব্বানী জলবায়ু সহনশীল পটুয়াখালী গড়ে তুলতে স্থানীয় জনগণ, বিশেষ করে যুব সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন। তিনি ভবিষ্যতেও এ ধরনের সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পরে আইইউবি প্রতিনিধির ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সমাপনী পর্ব শেষে উপস্থিত অতিথি, অংশগ্রহণকারী ও আয়োজকদের সম্মানে বিশেষ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।
অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশা, এ ধরনের অংশীজন পরামর্শ সভা স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও টেকসই করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং জলবায়ু সহনশীল পটুয়াখালী গঠনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
