সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান
সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের ঘণ্টা বাজিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, খুন, অপহরণ, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, মাদক, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমনে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষক মো. জুলকারনাইন।
দুই মাসে ৬০৫ খুন, ১৯৬ অপহরণ
টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে দেশে ঘটেছে ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই এবং ৯০টি ডাকাতির ঘটনা।
সংস্থাটি বলছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি। বরং ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও সহিংস অপরাধের প্রবণতা এখনও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়ে গেছে।
একই সময়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি। চুরির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১৪টি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৬টি।
ধর্ষণের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৯ থেকে ৭১টি।
গণপিটুনি ও মব সহিংসতা: কঠোর অবস্থান, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা
প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বারবার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
মার্চ ও এপ্রিল মাসে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৯ থেকে ৮০টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ থেকে ৪২ জন এবং আহত হয়েছেন ৭০ থেকে ১২৫ জন।
এ ছাড়া কারা হেফাজতে ১৪ থেকে ১৮ জনের মৃত্যু, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নির্যাতনে পাঁচজন আহত হওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনটি দাঙ্গার ঘটনাও রেকর্ড হয়েছে।
মাজার, সংখ্যালঘু ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় উদ্বেগ
টিআইবি বলছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে একজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার অপরাধে জড়িতদের ৪০ শতাংশই কিশোর
রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোর।
সংস্থাটির দাবি, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে।
সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপও তুলে ধরেছে টিআইবি
সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা, পর্যায়ক্রমে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব পুলিশের হাতে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত।
‘দুদকের ক্ষেত্রে সরকার আত্মঘাতী অবস্থানে’
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিন যেমন আশাব্যঞ্জক ও সম্ভাবনাময়, তেমনি সুশাসন, দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক দিকও স্পষ্ট।
তার ভাষায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা কার্যকর করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, “দুদকের ক্ষেত্রে সরকার আত্মঘাতী অবস্থান নিয়েছে। কমিশন থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিন মাসেও কমিশন গঠন না হওয়া দুর্ভাগ্যজনক ও বিব্রতকর।”
একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানান তিনি।
‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন ও দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রশাসন, ব্যাংক, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ও গোষ্ঠীগত বিবেচনায় নিয়োগ-পদায়ন অব্যাহত রয়েছে।
টিআইবির ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরে ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা দৃশ্যমান, যা নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে রূপ দেওয়ার উদ্যোগকে ইতিবাচক বলা হলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিল বা স্থগিত করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির মতে, এসব সিদ্ধান্ত কিছু ক্ষেত্রে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
১৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অব্যাহতি
শিক্ষা খাত নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের পর দেশের ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
সংস্থাটি আরও অভিযোগ করেছে, অনেক ক্ষেত্রে সার্চ কমিটি থাকলেও উপাচার্য নিয়োগে যথাযথ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন ব্যক্তিকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন ও প্রভোস্ট পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিবর্তন, পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা, উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্য সংঘর্ষ-সহিংসতার কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটির পুনর্গঠন, পুনঃভর্তি ফি বাতিল, লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালু, প্রতিবন্ধী শিশুবিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলি নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে টিআইবি।
সুশাসনের ঘাটতি দূর করার আহ্বান
সার্বিক মূল্যায়নে টিআইবি বলেছে, সরকার নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে বিভিন্ন খাতভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করলেও সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অভাব, দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক কৌশলের ঘাটতি সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সংস্থাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর প্রতিষ্ঠান গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
