তিন প্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাসে শুল্ক ফাঁকির দাবি, দুদক চেয়ারম্যানের কাছে ব্যবসায়ীর লিখিত অভিযোগ। ফাইল ছবি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাকিব ও রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ দাবি এবং শুল্ক ফাঁকির মাধ্যমে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য কুরিয়ারের মাধ্যমে খালাসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ‘এইচ. এম. আন্তর্জাতিক এজেন্সি’র লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পণ্য খালাসের ঘটনায় প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি শুল্ক ফাঁকির দাবি তুলে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। অভিযোগকারীর দাবি, এর আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আবারও বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করায় তিনি প্রতিকার চেয়ে দুদকের দ্বারস্থ হয়েছেন।
যেভাবে সামনে আসে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির একজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী। তাঁর অন্যান্য ব্যবসা থাকায় ঢাকা কাস্টমস হাউসের লাইসেন্স-সংক্রান্ত কার্যক্রম কর্মচারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সম্প্রতি তাঁর এক কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনটি বড় প্রতিষ্ঠানের পণ্য কুরিয়ারের মাধ্যমে খালাস করা হয়।
পরে অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব কুরিয়ারের মাধ্যমে পণ্যগুলো এসেছিল, সেগুলোর খালাস-সংক্রান্ত বিষয়টি ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাকিব এবং রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামানের নজরে আসে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ডেকে কিছু টাকা নিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করেন।
এরপর প্রায় ৩ কোটি টাকার বেশি শুল্ক ফাঁকি হয়েছে দাবি করে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন হুমায়ুন কবির। তাঁর দাবি, এত বিপুল অঙ্কের টাকা দেওয়া তাঁর ও তাঁর কর্মচারীর পক্ষে সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে তিনি বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হওয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অভিযোগপত্রে মো. আব্দুর রাকিবের প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, রাকিব কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অন্য কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নিতে বা আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ভয় পান।
অন্যদিকে, রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামান বর্তমান ডেপুটি কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) আমিনুলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধেও কেউ অভিযোগ করার সাহস পান না বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, প্রশাসনিক যোগাযোগ, ঘটনার নথি এবং অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্য-প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগে তিন প্রতিষ্ঠানের নাম
অভিযোগপত্রে পণ্য খালাস ও কথিত শুল্ক ফাঁকির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—
১. অ্যালেন অ্যাপারেলস লিমিটেড (Alien Apparel Ltd)
২. ইউরেনাস অ্যাপারেলস প্রাইভেট লিমিটেড (Uranus Apparels (Pvt.) Ltd)
৩. কুইক অ্যাপারেলস লিমিটেড (QUICK APPARELS LIMITED)
অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য কুরিয়ারের মাধ্যমে খালাসের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি সামনে আসে। তবে সংশ্লিষ্ট চালান, আমদানি নথি, শুল্ক নির্ধারণ, পণ্য খালাসের অনুমোদন এবং আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই ছাড়া শুল্ক ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
‘শুধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কেন দায়ী হবে?
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের প্রশ্ন, পণ্য খালাস হয়ে থাকলে এ ঘটনায় শুধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে দায়ী করা হবে কেন? তাঁর দাবি, পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় কুরিয়ার কর্তৃপক্ষ ও মূল আমদানিকারক পক্ষের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীর মতে, সংশ্লিষ্ট পণ্য খালাসের ঘটনায় অনিয়ম হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িত সব পক্ষের ভূমিকা যাচাই করে দায় নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে ঘুষ দাবি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাকিবের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামানের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং তদন্তের অগ্রগতি জানা গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ঢাকা কাস্টমস হাউসের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠানে ঘুষ দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগে উল্লিখিত তিন প্রতিষ্ঠানের পণ্য খালাসের নথি, সংশ্লিষ্ট চালান, শুল্ক পরিশোধের হিসাব, কুরিয়ার সংস্থার ভূমিকা এবং কথিত অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা সম্ভব।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক ও সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
উল্লেখ্য, ঘুষ দাবি ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগকারীর বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রামাণ্য নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
