বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুদকের চার্জশিটে আসামি, তবু স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান নাছির, এক কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা; নিয়োগের পরও যোগদানপত্র নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬ ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি মো. নাছির উদ্দিনকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ওষুধ, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজি সামগ্রী কেনাকাটায় এক কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় তিনি আসামি।

মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁর যোগদান নিয়ে আপত্তি তুলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ৬ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে যোগদান করলেও প্রায় এক মাস হতে চললেও তাঁর যোগদানপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ইমতিয়াজ হোসেনের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে গত ২ সেপ্টেম্বর নাছির উদ্দিনকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি ছয় বছরের বেশি সময় ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ছিলেন এবং রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন।

দুর্নীতির মামলায় চার্জশিটভুক্ত একজন কর্মকর্তাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি জানার পর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানা ছিল না। কেন এমন ঘটনা ঘটল, কীভাবে ঘটল, আজই ব্যবস্থা নেব।

মামলার নথিতে নাছিরের নাম

দুদকের করা মামলার চার্জশিট সূত্রে জানা গেছে, নাছির উদ্দিন ২০১৯ সালে সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা ছিলেন। ওই সময় তিনি আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিতে সার্জিক্যাল আইটেম অ্যান্ড ইকুইপমেন্টস এবং প্যাথলজিক্যাল আইটেম কেনা হয়।

দুদকের অভিযোগ, এসব উপকরণ টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে মানা হয়নি। এ প্রক্রিয়ায় এক কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে।

ঘটনার পর দুদক ও সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পৃথকভাবে অনুসন্ধানে নামে। প্রায় পাঁচ বছর তদন্তের পর সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই নাছির উদ্দিনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় দুদক।

এর আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুসন্ধানেও তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা জানানো হয়। শুরুতে তাঁকে সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। ২০২০ সালের ২৭ জুলাই স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর উপপ্রধান ও প্রোগ্রাম ম্যানেজারের পদ থেকে সরিয়ে তাঁকে ওএসডি করা হয়। এরপর তাঁকে রাজশাহী স্বাস্থ্য বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগ পর্যন্ত সেখানেই ওএসডি হিসেবে ছিলেন তিনি।

‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ওএসডি করা হয়েছিল’

ওএসডি হওয়ার বিষয়ে নাছির উদ্দিন বলেন, ‘২০২০ সালে মূলত আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপের (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ) এক নেতাকে বসাতে আমাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ওএসডি করে সাড়ে ছয় বছর কর্মহীন রাখা হয়েছিল।’

তবে তাঁর বিরুদ্ধে করা দুদকের মামলায় অভিযোগের বিষয়টি ভিন্ন। মামলাটি আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে।

একই মামলায় আরও ১০ আসামি

নাছির উদ্দিন ছাড়া মামলায় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাফিসা বিজনেস কর্নারের স্বত্বাধিকারী শেখ ইদ্রিস উদ্দিন চঞ্চল, মাতৃসদনের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. ইসরাত জাহান এবং শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. আমীর হোচাইন।

এ ছাড়া আসামির তালিকায় রয়েছেন সহকারী কো-অর্ডিনেটর ডা. মো. লুৎফুল কবীর খান, মেডিকেল অফিসার ডা. বেগম মাহফুজা দিলারা আকতার এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নাছের উদ্দিন। আরও রয়েছেন সাবেক সমাজসেবা কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার ও সাবেক মেডিকেল অফিসার ডা. আলেয়া ফেরদৌসী।

আসামিদের মধ্যে সাবেক সমাজসেবা কর্মকর্তা বিলকিস আক্তার পলাতক। অন্যরা জামিনে রয়েছেন।

বিচারপ্রক্রিয়া চলমান, বলছে দুদক

মামলার অগ্রগতি জানতে দুদকের সহকারী পরিচালক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আতাউর রহমান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আদালতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হতে কিছুটা সময় লাগছে। অনেক সাক্ষীর বক্তব্য, জবানবন্দি ও জব্দ তালিকা রয়েছে। আইনি নিয়ম মেনে প্রথমে মামলা দায়েরকারী বা বাদীর সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সাক্ষী ও জব্দ তালিকার সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সময় প্রয়োজন।

চার্জশিটভুক্ত কোনো ব্যক্তি সরকারি পদে বহাল থাকতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘চার্জশিটভুক্ত অবস্থায় কারও সরকারি পদে থাকার সুযোগ নেই।

প্রশাসনিক বিধি ও প্রথার কথা উল্লেখ করে আতাউর রহমান সরকার বলেন, ‘যেহেতু অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, তাই স্বাভাবিক চর্চা অনুযায়ী তাঁর সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) হওয়ার কথা কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।’

চার্জশিটভুক্ত হওয়ার পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান হলেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানা নেই। তবে এমন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হলে বিধি অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেবে।

নাছিরের দাবি, ‘চার্জশিটে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই’

অন্যদিকে নাছির উদ্দিনের দাবি, চার্জশিটে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘চার্জশিটে আমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই, কেবল নাম রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে আদালতে অব্যাহতির আবেদন করেছি; সেখানে সুরাহা না হলে হাইকোর্টে যাব। যেহেতু আমি বরখাস্ত নই, তাই পদে বহাল থাকায় কোনো আইনি বাধা নেই।

নিয়োগের পরও যোগদানপত্র ঝুলে আছে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী গত ৬ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান হিসেবে যোগদান করেন নাছির উদ্দিন। তবে তাঁর নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে প্রায় এক মাসেও তাঁর যোগদানপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ রুমী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি। আমাদের কাছে তাঁর (নাছির উদ্দিন) অনিয়মের বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। ফলে তাঁর যোগদানপত্র এখনও গ্রহণ করা হয়নি।’

দুদকের নথি এখনও অধিদপ্তরের হাতে পৌঁছেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুদকের কাগজ হাতে পাইনি। যেহেতু তিনি চার্জশিটভুক্ত আসামি, ফলে এ পদে থাকার বিষয়টি আমাদের দেখতে হচ্ছে। সবকিছু দেখে বিধি অনুযায়ী বহিষ্কার কিংবা অন্য কোনো শাস্তি দেওয়া হবে।

ডিজির দপ্তর রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে যোগদান নেয়নি’

মহাখালীতে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধানের কার্যালয়ে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নাছির উদ্দিনের সঙ্গে সরাসরি কথা হয়। যোগদানপত্র গ্রহণ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আমি যোগদানপত্র জমা দিলেও ডিজির (মহাপরিচালক) দপ্তর থেকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে এখনও তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি। অথচ এই মামলায় আমাকে বরখাস্ত করা যায় না। কারণ আমি কেনাকাটা বা টেন্ডার কমিটির কেউ ছিলাম না। অনুপস্থিত সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি হিসেবে কেবল একটি স্বাক্ষর করেছিলাম।

‘তথ্য ছিল, তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন’

চার্জশিটভুক্ত আসামি নাছির উদ্দিনকে কীভাবে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান করা হলো—এ বিষয়ে জানতে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষরকারী উপসচিব ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য ছিল তিনি ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। তাই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

যাচাই-বাছাই না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে উপসচিব বলেন, ‘তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি যোগদানপত্র গ্রহণ না করে থাকে, তাহলে তারা তথ্য নিয়ে মন্ত্রণালয়কে জানালে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ বলেন, ‘বিষয়টি জানা ছিল না। আপনার মাধ্যমে জানলাম। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।

সাড়ে ছয় বছর ওএসডি, নিউ ইস্কাটনে ফ্ল্যাট

নাছির উদ্দিন ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা। প্রায় সাড়ে ছয় বছর তিনি ওএসডি ছিলেন। বর্তমানে রাজধানীর নিউ ইস্কাটন সড়কের এ-৩০১, সেল আফরোজা মোতালেব স্বপ্নধারা ৯০/৯১-এর একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। তাঁর দাবি, এক কোটি সাত লাখ টাকায় ফ্ল্যাটটি কিনেছেন।

ফ্ল্যাট কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে নাছির উদ্দিন বলেন, ‘ফ্ল্যাটটি কিনতে ১০ বছর কিস্তি দিতে হয়েছে। পৈতৃক জমি বিক্রি করে, ব্যাংক থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ এবং অগ্রিম প্রভিডেন্ট ফান্ড তুলে কিনেছি।’

উল্লেখ্য যে, প্রতিবেদনে নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে থাকা বিষয়গুলো অভিযোগ, দুদকের চার্জশিট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য হিসেবে রাখা হয়েছে; আদালতে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।