জুয়েল হাসান সাদ্দাম
কারাগারের উঁচু গেটের সামনে থেমে থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্স, ভেতরে নিথর দুই দেহ—একজন স্ত্রী, আর মাত্র ৯ মাসের এক শিশু। সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক স্বামী ও বাবা, হাতে শেকল, চোখে শূন্যতা। সময় ছিল মাত্র পাঁচ মিনিট। এই পাঁচ মিনিটেই শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন জুয়েল হাসান সাদ্দাম।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় মানবিক বিবেচনায় সাদ্দামকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।
সোমবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। স্ত্রী ও শিশুসন্তান হারানোর করুণ বাস্তবতাকে সামনে রেখে আদালত এই জামিন মঞ্জুর করেন বলে জানিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা।
তিনি বলেন, সাদ্দামের বিরুদ্ধে থাকা সাতটি মামলার মধ্যে ছয়টিতে আগেই জামিন হয়েছিল। একটি মামলার শুনানি বাকি ছিল, সেই মামলাতেই আজ জামিন দেওয়া হলো। একই সঙ্গে কেন তাকে স্থায়ী জামিন দেওয়া হবে না—তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেছেন আদালত।
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ সংগঠন) সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। এরপর থেকে একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে রাখা হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে।
কিন্তু কারাগারের ভেতরে থাকা অবস্থাতেই তার জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়।
২৩ জানুয়ারি বিকেলে বাগেরহাট সদর উপজেলার বেখেডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় তার স্ত্রী কানিজ সুরভানা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ। পাশের কক্ষেই পাওয়া যায় তাদের ৯ মাস বয়সী শিশুপুত্র নাজিমের নিথর দেহ।
পুলিশ ও পরিবারের ধারণা, চরম মানসিক বিষণ্নতা থেকে সন্তানকে হত্যার পর স্বর্ণালী আত্মহত্যা করেন।
এই ঘটনায় সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মানুষের প্রশ্ন ছিল—একজন স্বামী ও বাবাকে কি অন্তত শেষ বিদায়ের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা যায়?
পরদিন, ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অবশেষে এক করুণ সমঝোতা আসে। যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের গেটেই অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ আনা হয়। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সন্ধ্যা ৭টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সটি কারাগারের সামনে পৌঁছায়। আধা ঘণ্টা পর ছয়জন নিকট আত্মীয়সহ মরদেহ নিয়ে জেলগেটের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
ভেতরে সময়—মাত্র পাঁচ মিনিট।
পাঁচ মিনিট পরই আবার গেট খুলে দেওয়া হয়। বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের কান্নায় তখন পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। দুটি মাইক্রোবাসে করে আসা ১২–১৫ জন স্বজন অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
একদিকে কারাগারের গেট, অন্যদিকে নিথর দুটি দেহ—এই দৃশ্যই যেন হয়ে উঠেছিল শোকের নিঃশব্দ সাক্ষী।
আজ সেই শোকবিদ্ধ মানুষটি ছয় মাসের জামিন পেলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—আইনের বাইরে দাঁড়িয়ে মানবিকতার যে ক্ষত, তার কি কখনো পূর্ণ নিরাময় হয়?
