অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও নেই জবাবদিহি—গণপূর্তে জমছে চাপা ক্ষোভ, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কি শুধু কাগজে?
গণপূর্ত ভবনের করিডোরে যেন সময় থমকে আছে। বাইরে সংস্কার, স্বচ্ছতা আর পরিবর্তনের উচ্চকিত স্লোগান—কিন্তু ভেতরে কি এখনও সেই পুরোনো ছায়ার দাপট? অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরও সংশ্লিষ্টদের নীরবতা ভাঙে না—এতে প্রশ্ন আরও তীব্র হচ্ছে: গণপূর্তে আদৌ কি পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে?
সম্প্রতি প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গণপূর্ত
অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয়ের নানা অনিয়ম ও অভিযোগ তুলে ধরা হয়। তবে সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পরও অভিযুক্তদের কাছ থেকে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক রদবদলে শামীম আখতারের অবসরের পর খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় কিছু ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন এখনো সীমিত। সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম সংক্রান্ত বিতর্ক এবং ন্যাম ভবনে দরপত্র আহ্বানের আগেই পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে অগ্রিম কাজ শুরুর অভিযোগ—এসব বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য মেলেনি।
নীরব কর্তৃপক্ষ, বাড়ছে প্রশ্ন-প্রশাসনিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন কোনো দৃশ্যমান তদন্ত নেই? অভিযোগ রয়েছে, এখনো পর্যন্ত অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি, যদিও গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি, নেওয়া হয়নি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ফলে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, এত বড় অভিযোগের পরও যদি কোনো তদন্ত বা কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি হয়। এতে মনে হয়—সবকিছু আগের মতোই চলছে।
নেতৃত্বে কি পুরোনো ছায়া? সরকার পরিবর্তনের পরও শীর্ষ পদে থাকা কিছু কর্মকর্তাকে ঘিরে পুরোনো প্রভাববলয়ের অভিযোগ এখনো আলোচনায়। প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের সময়ে গড়ে ওঠা শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের প্রভাব এখনো পুরোপুরি ভাঙা যায়নি—এমনটাই দাবি অভ্যন্তরীণ সূত্রের।
আবার বর্তমান নেতৃত্বে দায়িত্ব পরিবর্তন হলেও বাস্তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বড় অংশ এখনও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি বণ্টন, প্রকল্প অনুমোদন ও বদলির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে এই প্রভাব স্পষ্ট—যা সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
প্রতিবেদনের পর চাপা ক্ষোভ- অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর গণপূর্তের ভেতরে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। অনেক কর্মকর্তার মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আরও বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসতে পারে।
এক সাবেক আমলা বলেন, সংস্কার তখনই বাস্তব হবে, যখন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। না হলে পরিবর্তনের গল্প কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বড় প্রশ্ন রয়ে যায়- প্রতিবেদন প্রকাশের পরও নেই জবাবদিহি, নেই দৃশ্যমান পদক্ষেপ—এ অবস্থায় প্রশ্নটা এখন আরও স্পষ্ট: গণপূর্ত অধিদপ্তরে কি সত্যিই নতুন সময়ের সূচনা হয়েছে, নাকি পুরোনো ক্ষমতার বলয় এখনো অটুট? সরকার বদলেছে, স্লোগান বদলেছে—কিন্তু সিস্টেম কি এখনও একই চক্রের নিয়ন্ত্রণে?
গণপূর্ত অধিদপ্তর শুধু অবকাঠামো নির্মাণের প্রতিষ্ঠান নয়—এটি জনগণের আস্থার প্রতীকও। আর সেই আস্থার জায়গাটি যদি অস্বচ্ছতা ও নীরবতার ছায়ায় ঢাকা পড়ে, তাহলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কেবল পোস্টারের শব্দ হয়েই থেকে যায়।
এদিকে সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম কেলেঙ্কারির অভিযোগে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়—এই নীরবতা ভাঙবে কবে, আর আদৌ কোনো জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা পাবে কি না।
প্রতিবেদন তৈরির আগে তদন্ত কমিটির বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।
