নারায়ণগঞ্জে বন্দুক হাতে দুই তরুণের ভিডিও ভাইরাল। ছবি: সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর পার্কে (সাবেক শেখ রাসেল পার্ক) দুই তরুণের বন্দুক হাতে ঘোরাফেরা এবং দর্শনার্থীদের দিকে অস্ত্র তাক করে প্রতিক্রিয়া ধারণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। মাত্র ৩৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই নগরজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, আফগানিস্তানের মানুষের পোশাকের আদলে লম্বা কুর্তি-পায়জামা ও মাথায় টুপি পরা দুই তরুণ বড় আকৃতির দুটি বন্দুক হাতে পার্কে প্রবেশ করছেন। এরপর সামনে যাকে পাচ্ছেন, তার দিকেই বন্দুক তাক করছেন। রিকশাচালক, পথচারী থেকে শুরু করে শিশুও বাদ যাচ্ছে না।
বন্দুক তাক করতেই কেউ থমকে যাচ্ছেন, কেউ আতঙ্কে সরে যাচ্ছেন, আবার কেউ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকছেন। আর এসব মানুষের তাৎক্ষণিক ভয় ও বিস্ময়ের মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধারণ করছেন পেছনে থাকা একজন ক্যামেরাম্যান।
ভিডিওটি প্রথমে ‘ভাইবোন’ নামের একটি টিকটক পেজে আপলোড করা হয়। পরে এটি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর অনেক নেটিজেন এর সমালোচনা করেছেন।
নেটিজেনদের কেউ বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে এভাবে বন্দুক প্রদর্শন করে মানুষকে ভয় দেখানোর ভিডিও তৈরি করা মোটেও ঠিক হয়নি। কেউ আশঙ্কা করছেন, এমন ভিডিও বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করতে পারে। আবার অনেকে প্রশাসনের প্রতি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, অবাধে অস্ত্র প্রদর্শনের এমন দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এর সুযোগ নিয়ে অন্যরাও অনুরূপ কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হতে পারে।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিওটি কোনো বাস্তব অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা নয়। মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ধারণ করতেই পরিকল্পিতভাবে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট দুই তরুণের একজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভাইরাল হওয়ার উদ্দেশ্যে ভিডিওটি তৈরি করেছেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বাসিন্দা লিমন তোহা ও ইয়াসিন। লিমন তোহা নারায়ণগঞ্জ শহরের দিগুবাবুর বাজার এলাকায় তার পৈতৃক দোকানে বসেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করেন। পরে সেসব ভিডিও টিকটক, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে প্রকাশ করেন।
আর ইয়াসিন মূলত লিমন তোহার ভিডিও ধারণের কাজে সহযোগিতা করেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বন্দুক হাতে ভিডিওটি প্রথমে টিকটকের ‘ভাইবোন’ নামের অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়। ওই অ্যাকাউন্টে লিমন ও তার বোন বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করে প্রকাশ করেন। পরে একই ভিডিও ‘লিমন সিন্স ২০০৪’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট এবং ‘ওয়াফি লিমন’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও প্রকাশ করা হয়। তিনটি অ্যাকাউন্টই নিজের বলে দাবি করেছেন লিমন।
লিমন তোহা বলেন, টিকটকে এ ধরনের ভিডিওর ট্রেন্ড দেখে তিনি ভিডিওটি তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল বন্দুক দেখে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ধারণ করা।
তিনি দাবি করেন, এটি মূলত ফানি ভিডিও হিসেবে বানানো হয়েছিল। কিন্তু ফেসবুকে দেওয়ার পর অনেকে এটিকে নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছেন। আমরা শুধু মানুষের ভয় পাওয়ার অংশটুকু প্রকাশ করেছি। পরে তারা যে মজা করেছেন, সেই অংশটি প্রকাশ করিনি।
লিমন জানান, তিনি পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সিনেমা ও নাটক দেখেন। সেসব নাটক ও সিনেমার কিছু দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের মতো করে ভিডিও তৈরি করেন। পাকিস্তানি ভিডিও ও নাটকের আদলে তৈরি কনটেন্টে তিনি বেশি সাড়া পান। এরপর থেকেই ওই ধরনের ভিডিও তৈরির প্রবণতা বেড়েছে বলে জানান তিনি।
নিজের তৈরি কনটেন্ট নিয়ে নানা সমালোচনা হলেও দেশের প্রতি তার অবস্থান স্পষ্ট বলেও দাবি করেন লিমন।
তবে বন্দুক দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর কাজটি সঠিক কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে লিমন তোহা বলেন, “এটা অপরাধ কি না, বুঝতে পারছি না। এটা শুধুই মজা করে তৈরি করা।
এদিকে ভিডিওটি নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি সাজেদুর রহমান বলেন, এমন কোনো ভিডিওর বিষয়ে তার জানা নেই। তবে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হবে। কারা ভিডিওটি তৈরি করেছে, সে বিষয়েও তথ্য নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত এ নিয়ে পুলিশের কাছে লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ আসেনি।
