সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছে ৭ বছরের নিশান মণ্ডল। পাশে ছোট ভাই সৃজন। সোমবার কাশিয়ানীর সিঙ্গা গ্রামে। ছবি: সংগৃহীত
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর নিস্তব্ধ সকাল যেন হঠাৎই ভরে ওঠে এক হৃদয়বিদারক প্রশ্নে— “বাবা কবে ফিরবে?”
সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি ছোট্ট অবয়ব, নিশান (৭) আর সৃজন (৫)। চোখে অনন্ত অপেক্ষা, বুকভরা অজানা শূন্যতা। তারা জানে না, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়—বাবা মিলন মণ্ডল—এখন কারাগারের অন্ধকারে বন্দি। আর মা? তিনি তো দুদিন আগেই চিরবিদায় নিয়েছেন, রেখে গেছেন এক অসহনীয় শূন্যতা।
শনিবার সিঙ্গা গ্রামের ঘর থেকে উদ্ধার হয় স্বপ্না বাড়ৈয়ের (২৬) ঝুলন্ত লাশ। সেই এক মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় একটি সংসার। আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার হন স্বামী মিলন, রোববারই আদালতের মাধ্যমে পাঠানো হয় কারাগারে। আর সেই থেকে—দুই শিশুর পৃথিবী থমকে গেছে। প্রতিবেশীর বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় মিললেও, মায়ের আদর আর বাবার স্নেহহীন এই পৃথিবী তাদের কাছে এখন অচেনা, নির্মম। মাঝে মাঝে কান্নায় ভেঙে পড়ে নিশান, ছোট ভাই সৃজন শুধু তাকিয়ে থাকে—বোঝার চেষ্টা করে, কেন হঠাৎ সব বদলে গেল!
এদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য, নয় বছর আগে ভালোবাসা আর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল মিলন-স্বপ্নার সংসার। দিনমজুর মিলনের সীমিত আয়ে চললেও শুরুটা ছিল শান্ত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্বপ্নার মানসিক অসুস্থতা ধরা পড়ে। খুলনা থেকে শুরু করে পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা—সবই হয়েছিল মানুষের সহায়তায়।
কিন্তু অভাব বড় নির্মম। চিকিৎসা থেমে যায়, অসুস্থতা আবার ফিরে আসে। আর সেই অন্ধকারেই একদিন হারিয়ে যান স্বপ্না—শুক্রবার রাতে দুই শিশুকে রেখে নিজেই ঝুলে পড়েন মৃত্যুর ফাঁদে। স্বপ্নার বাবা পরেশ বাড়ৈ অভিযোগ তুলেছেন, মানসিক চাপ আর পারিবারিক অশান্তিই তার মেয়েকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদিও প্রতিবেশীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের মানসিক সমস্যাই ছিল মূল কারণ।
এখন সেই ঘটনার পর—বাবা কারাগারে, দাদা-চাচারা পলাতক। ফাঁকা বাড়ি, শূন্য উঠান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে এক অসহায় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে নিশান ও সৃজন। তাদের ছোট্ট কণ্ঠে একটাই প্রশ্ন—বাবা কবে ফিরবে?
কাশিয়ানী থানার ওসি মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু আইনের হিসাব-নিকাশের বাইরে—এই দুই শিশুর চোখে জমে থাকা অশ্রুর উত্তর কে দেবে?
কে বলবে—তাদের ভাঙা পৃথিবী আবার কবে জোড়া লাগবে?
