রবিবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বিএডিসিতে নীতিমালা লঙ্ঘন করে পিডি নিয়োগের অভিযোগ, টেন্ডার কারসাজির অভিযোগেও বহাল ইব্রাহিম খলিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ২৪, ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে চাকরির মেয়াদ ও অভিজ্ঞতার শর্ত ভঙ্গের দাবি, পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিয়োগ বাতিলের দাবি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ইব্রাহিম খলিল। ফাইল ছবি

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএডিসি) নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কারসাজি এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়াকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সংস্থাটির ‘বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থাদির আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়ন (২য় পর্যায়)’ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. ইব্রাহিম খলিল। তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও প্রভাব খাটিয়ে দরপত্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদার। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। চাকরির অবশিষ্ট মেয়াদ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তাঁকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, দরপত্রের বিপরীতে তাঁদের পছন্দের ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেও তাঁরা প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেছেন।

চাকরির মেয়াদ ও অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়ে প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএডিসির ‘বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থাদির আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়ন (২য় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মেয়াদ মার্চ ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৮ পর্যন্ত। প্রকল্পটির পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে জারি করা ২০.৮০৪.০২২.০০.০০.০০৬.২০১০/৪ স্মারকের নির্দেশনার ৩.২(ঙ) উপধারায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ থাকার শর্তের কথা উল্লেখ রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ড. মো. ইব্রাহিম খলিলের চাকরির মেয়াদ প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। ফলে তাঁকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ ছাড়া একই নির্দেশনার ৩.২(খ) উপধারায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ও প্রকিউরমেন্ট-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের যে শর্ত রয়েছে, সেসব যোগ্যতার ক্ষেত্রেও তাঁর ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব শর্তের আলোকে তাঁর নিয়োগের বৈধতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি, চাকরির মেয়াদ এবং প্রশিক্ষণের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

তিন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাবের পর নিয়োগ

জানা গেছে, বিএডিসির চেয়ারম্যান ১৫ জুলাই ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনজন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করেন। এর পরপরই নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে কয়েকটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখের আদেশে ড. মো. ইব্রাহিম খলিলকে প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

নিয়োগের আগে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা। তাঁদের বক্তব্য, নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা ও প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুসরণ করা হলে এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হতো না।

ভুক্তভোগী কয়েকজন সাধারণ ঠিকাদার অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কৃষি উপদেষ্টা ও কৃষি সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন বলেও জানা গেছে। তাঁরা দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিবিধান অনুসরণের দাবি জানান।

পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ

প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ প্রদান নিয়ে ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাঁদের দাবি, দরপত্রের বিপরীতে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত তাঁরা কার্যকর প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেছেন।

একাধিক সূত্রের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের মান, বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও কাঙ্ক্ষিত সুফলের তুলনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে দাপ্তরিক নথি, দরপত্রের তুলনামূলক বিবরণ কিংবা আর্থিক লেনদেনের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের প্রভাব কাজ করেছে। তাঁদের অভিযোগ, যোগ্যতার প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও বিশেষ বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার কারণে সংস্থার ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের কথাও শোনা যাচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেন। তবে এ ধরনের লেনদেনের বিষয়ে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক প্রভাব ও পদোন্নতি নিয়ে আলোচনা

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইব্রাহিম খলিলের সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও কৃষিবিদ বাহাউদ্দিন নাছিমের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বিএডিসির বিভিন্ন মহলে আলোচিত ছিল। তাঁদের দাবি, ওই সময়ে দীর্ঘদিন ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন এবং একাধিক কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা পদোন্নতির পেছনে কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে এসব দাবিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে শঙ্কা

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মানসম্মত বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে বিএডিসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি প্রকল্পে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক বিধিবিধান অনুসরণ করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তাঁদের মতে, ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা প্রভাবের পরিবর্তে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা হলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হয়। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

নিয়োগ বাতিল ও তদন্তের দাবি

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠায় বিএডিসির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ নিয়োগটি পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজন হলে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়া, কার্যাদেশ প্রদান, প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

তাঁদের মতে, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সময় অনুসরণ করা নীতিমালা, চাকরির অবশিষ্ট মেয়াদ, প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা, প্রকিউরমেন্ট-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ এবং দরপত্রের নথি যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থানও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

এদিকে, প্রকল্প পরিচালক ড. মো. ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং দরপত্রসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে। এতে সরকারি অর্থের সুরক্ষা, প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পথ তৈরি হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।