১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর বিভিন্ন ঘটনার মুহূর্ত। ছবি: আনন্দবাজার ও নিউইয়র্ক টাইমস/ ইলাস্ট্রেশন: ছবি সমকাল পত্রিকার সৌজন্যে
শেষ ট্রেনটি ছেড়ে যায় ২৬ মার্চ সকালে। জনপরিত্যক্ত দর্শনা রেলস্টেশনে স্টেশন মাস্টারের খাতায় লেখা ছিল এমন তথ্য। ৫ ডিসেম্বর এলাকাটি পরিদর্শনে গিয়ে সেই খাতার সন্ধান পান বিদেশি সাংবাদিকরা।
৪ ডিসেম্বর রাতে দর্শনা থেকে পালিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। সে খবর পেয়ে লুকিয়ে থাকা বাঙালিদের কেউ কেউ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। বাংলাদেশে যুদ্ধ চলাকালে যশোরের দর্শনা (বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার শহর) ঘোরার এমন অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক সিডনি শনবর্গ। পত্রিকাটির সে সময়কার প্রতিবেদনের পাশাপাশি দর্শনার চিত্র নিয়ে বর্ণনা পাওয়া যায় শনবার্গের লেখা ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ: নাইন্টিন সেভেনটিওয়ান’ বইয়ে।
দর্শনায় সেদিন বিদেশি সাংবাদিকরা দেখেন, একরের পর একর আখের ক্ষেত আগাছায় ঢেকে আছে। অবহেলিত অবস্থায় হলুদ ফুলে ভরা বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেত। প্রকাশ্যে আগাগোনা কম থাকলেও ভিনদেশিরা নজরে পড়ামাত্র ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সাংবাদিকদের ওই বহরে ছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত। তিনি লিখেন, সময়টা ছিল শীতের পড়ন্ত বিকেল। পাকিস্তানি বাহিনীর পালানোর খবর এরই মধ্যে শরণার্থী শিবিরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
অনেকেই ফিরতে শুরু করেছেন। দর্শনা থেকে চার মাইল পূর্বের চুয়াডাঙ্গা সড়কে গিয়ে পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত গাড়ি ও অস্ত্র দেখা যায়। সঙ্গে থাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ব্রিফ করেন, চীন ও আমেরিকার দেওয়া এমন আরও অস্ত্র জব্দ করেছে সেনারা।
‘আত্মসমর্পণ অথবা মৃত্যু’
৫ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর মধ্যে ছিল লাকসাম, আখাউড়া, ময়মনসিংহের বকশিগঞ্জ, কুমিল্লার মিয়াবাজার, পারিকোট, লালবাগ ও যশোরের কোটচাঁদপুর (বর্তমানে ঝিনাইদহের উপজেলা)। যুগান্তরের প্রতিবেদনে লেখা হয়, যশোরকে সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করার পর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ‘আত্মসমর্পণ অথবা মৃত্যু, এর একটি বেছে নাও’। এদিন বিভিন্ন রণাঙ্গনেও এমন ঘোষণা দেওয়া হয়। বলা হয়, আত্মসমর্পণ করলে জেনেভা রীতি অনুযায়ী শত্রুপক্ষের সৈন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হবে।
সেদিন কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কৌশলের একটি বর্ণনা পাওয়া যায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জেকবের বই ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’য়। এতে বলা হয়েছে, দর্শনা, কোটচাঁদপুর ও কালীগঞ্জ দখলের পর ৪ মাউন্টেন ডিভিশন মূল সড়ক ধরে ঝিনাইদহের দিকে অগ্রসর হওয়ার বদলে মাঠের মধ্য দিয়ে উত্তর দিকে আক্রমণ চালায়। চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের মাঝে এক ব্যাটালিয়ন স্কোয়াড্রনের একটি রোড ব্লক স্থাপন করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা এই অবরোধ ভাঙার চেষ্টায় ব্যর্থ হলে ঝিনাইদহে নতুন করে শক্তি বৃদ্ধির পরিবর্তে কুষ্টিয়ার দিকে সরানো হয়। এক সময় ৪১ মাউন্টেন ব্রিগেড ঝিনাইদহে প্রবেশ করে।
আখাউড়া ও লাকসাম পতনের ফলে চট্টগ্রাম, ফেনী, চাঁদপুর, কুমিল্লা, সিলেট ও ঢাকার মধ্যে রেল সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয় (যুগান্তর, ৬ ডিসেম্বর)।
‘পাকিস্তানিরা বিচ্ছিন্ন’
স্থলভাগে কিছু এলাকার পর ৫ ডিসেম্বর আকাশপথেও প্রতিরোধহীন হয়ে পড়ে পাকিস্তানের বাহিনী। ৪ ডিসেম্বর ঢাকায় ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই শুরু হয়েছিল। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে লেখা হয়, এর ৩৬ ঘণ্টার মাথায় বাংলাদেশের আকাশে পাকিস্তানিরা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
এদিন ভারতীয় জঙ্গি বিমান বিনা বাধায় গোটা বাংলাদেশের আকাশে উড়ে বেড়ায়। ঢাকার কুর্মিটোলাসহ বিভিন্ন ঘাঁটিতে বোমা ফেলে। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর অসংখ্য গাড়ি ও বাঙ্কার ধ্বংস হয়। বড় বড় ঘাঁটির মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঢাকার সঙ্গে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের, নাটোরের সঙ্গে ঢাকা ও রংপুরের এবং যশোরের সঙ্গে নাটোর ও রাজশাহীর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শোচনীয় হতে থাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থা।
যদিও সেদিন এপিপির বরাত দিয়ে ইত্তেফাকে প্রকাশ হয়, আকাশ যুদ্ধে পাকিস্তানিরা আধিপত্য বজায় রেখেছে। ভূপাতিত করা হয়েছে ৬১টি ভারতীয় বিমান। দর্শনা ও ঠাকুরগাঁওয়ে ভারতীয় বাহিনীর চাপ বৃদ্ধি ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে।
উত্তপ্ত নিরাপত্তা পরিষদ:
বাংলাদেশের জন্য ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব ভোটের জন্য তোলা হয়। সেটি ছিল পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও উভয়পক্ষের সেনা প্রত্যাহার সংক্রান্ত। রাশিয়া ভেটো দিলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়।
পরিষদে রাশিয়াও একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আগে পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। ১২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকলেও ভেটো দেয় চীন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোভিয়েতের খসড়া প্রস্তাবটি ভিন্ন রকম ছিল। কারণ এতে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়নি। বরং পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তানে সহিংসতা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। এতে ভেটো দেওয়ার ব্যাখ্যার সময় চীনের প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া অভিযোগ করেন, রাশিয়ার খসড়া প্রস্তাবটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল।নিরাপত্তা পরিষদে এই বিতর্ক চলার সময় দর্শক সারিতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি দলের প্রধান আবু সাঈদ চৌধুরী।
স্বীকৃতির অপেক্ষা
মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। যুগান্তরের ৬ ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের কাছে খন্দকার মোশতাক ঘোষণা দেন, ‘ভারত যে কোনো মুহূর্তে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা স্বীকৃতি পেতে পারি।’ সেদিন খন্দকার মোশতাক আরও বলেছিলেন, ভৌগোলিক কারণেই ভারতের কাছ থেকে প্রথমে স্বীকৃতি প্রয়োজন।
একই দিন নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব কে বি লাল। আনন্দবাজারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কে বি লাল একটি পৃথক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীন সত্ত্বা স্বীকার করে নেন। অস্থায়ী সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরাও তখন চূড়ান্ত স্বীকৃতির জন্য নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছিলেন।
