শিহাব উদ্দিন। ফাইল ছবি
রাজধানীতে অনুমোদনবহির্ভূত ভবন নির্মাণ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ফল। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও বন্ধ হয়নি অবৈধ নির্মাণকাজ। বরং অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট ভবনমালিকদের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন ৭/১-এর ইমারত পরিদর্শক মো. শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে। এককালীন দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ভবন থেকে নিয়মিত মাসিক অর্থ নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।
রাজউকের জোন ৭/১-এর আওতাধীন দনিয়া, দক্ষিণ দনিয়া, পাটেরবাগ, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইপাড় ও নামা শ্যামপুর এলাকায় অনুমোদনবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং নির্মাণকাজে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, অভিযান পরিচালনার পরও কিছু ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ না হয়ে বরং নতুন করে গতি পেয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ইমারত পরিদর্শক মো. শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাজউক জোন ৭/১-এর পক্ষ থেকে তালিকাভুক্ত কয়েকটি ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। কিন্তু অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট ভবনমালিকদের আশ্বস্ত করা হয়, ভবিষ্যতে এসব ভবনে আর মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে না। অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে অনুমোদিত নকশা ও প্রচলিত বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েও নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
মোবাইল কোর্টের তালিকায় যেসব ভবন
মোবাইল কোর্ট পরিচালিত ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে মদিনাবাগ দক্ষিণ দনিয়া এলাকার তালুকদার কাসেমের ভবন, পাটেরবাগ ইতালি মার্কেটের পেছনে আলী জিন্নাহ গংয়ের ভবন, পাটেরবাগ এলাকার মালিক হিরনের ভবন, একই এলাকার ‘মায়ের বাড়ি’ নামে পরিচিত ভবন, লিলি বিল্ডার্সের ১০ তলা ভবন, মায়ের বাড়ির পাশের আবুল হোসেনের তিনতলা ভবন এবং পাটেরবাগ এলাকার তুহিনের নয়তলা ভবন।
এসব ভবনের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ‘মায়ের বাড়ি’ নামে পরিচিত ভবনটি। অভিযোগ রয়েছে, ১০ তলা নির্মাণের অনুমোদন থাকলেও সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ১১ তলা। পাশাপাশি রাস্তার জায়গা দখল করে ভবন সম্প্রসারণের অভিযোগও রয়েছে। অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের সামঞ্জস্য, রাস্তার জায়গা দখলের অভিযোগ এবং মোবাইল কোর্টের পর নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকার বিষয়গুলো সরেজমিন যাচাইয়ের দাবি রাখে।
অভিযানের পরও নির্মাণকাজ, দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, ২৭ সেপ্টেম্বরের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পর সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ভবনের মালিকের কাছ থেকে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। শুধু এককালীন অর্থ আদায় নয়, জোন ৭/১-এর আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণ ও নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে নিয়মিত মাসিক অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্বাধীন এলাকায় অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, অর্থ লেনদেনের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
২০২৪ সাল থেকে একই জোনে দায়িত্ব, সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন
আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালে রাজউকে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই শিহাব উদ্দিন জোন ৭/১-এর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দায়িত্বাধীন দনিয়া, কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইপাড়, দক্ষিণ দনিয়া, পাটেরবাগ ও নামা শ্যামপুর এলাকার বিভিন্ন ভবন থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
শুধু দায়িত্ব পালন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, নিজ জেলা পাবনায় তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সেখানে রয়েছে দুইতলা বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, একাধিক দোকানপাট, বিঘার পর বিঘা জমি এবং মাছের ঘের।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্জনের সময়কাল, অর্থের উৎস এবং তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানের মাধ্যমেই এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্ন রাজউকের তদারকি নিয়ে
রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রধান কাজ হলো অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজধানীর পরিকল্পিত ও নিরাপদ নগরায়ণ নিশ্চিত করা। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও অর্থের বিনিময়ে অবৈধ নির্মাণ অব্যাহত রাখার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; বরং রাজউকের মাঠপর্যায়ের তদারকি, অভিযান পরিচালনা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নগর উন্নয়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
বিশেষ করে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনুমোদনবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, অতিরিক্ত তলা সংযোজন এবং রাস্তার জায়গা দখলের মতো অভিযোগ নগরবাসীর নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি, দুদকের অনুসন্ধানের প্রশ্ন
এ অবস্থায় ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পরিচালিত মোবাইল কোর্টের অভিযানসংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের বর্তমান অবস্থা এবং অভিযানের পর নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখার কারণ খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে ভবনমালিকদের কাছ থেকে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা আদায় এবং নিয়মিত মাসিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা এবং ইমারত পরিদর্শক মো. শিহাব উদ্দিনের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিহাব উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তদন্তের আশ্বাস রাজউকের
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজউক জোন ৭/১-এর ইমারত পরিদর্শক মো. শিহাব উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে রাজউক জোন ৭/১-এর অথরাইজড কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলাম। ইমারত নির্মাণে বিধিবিধানের ব্যত্যয় রোধে রাজউক বদ্ধপরিকর। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুনরায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। ইমারত পরিদর্শক শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো শুধু আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ, অনুমোদিত নকশা বাস্তবায়ন, অভিযানের পরবর্তী কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নগরবাসীর প্রশ্ন—মোবাইল কোর্টের অভিযান যদি অবৈধ নির্মাণ বন্ধই করতে না পারে, তাহলে সেই অভিযানের কার্যকারিতা ও পরবর্তী তদারকির দায়িত্ব কার?
এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে….
