জামালপুর শহরের বাতাসে এখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা—পেট্রোল বা অকটেন যেন আর কেবল জ্বালানি নয়, হয়ে উঠেছে ভাগ্যের পরীক্ষা, প্রভাবের প্রমাণ, আর সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক।
এদিকে রাত নামে, কিন্তু নিভে না অপেক্ষার প্রদীপ। শত শত মোটরসাইকেল সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে ফিলিং স্টেশনের সামনে—কেউ সিটে বসে, কেউ হ্যান্ডেলে মাথা রেখে, কেউবা ক্লান্ত চোখে ভোরের আলো গোনে। প্রত্যেকের মনে একটাই আশা—একটু জ্বালানি, একটু স্বস্তি।
কিন্তু ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সেই আশার বুকেই যেন আঘাত হানে এক অদৃশ্য শক্তি। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন—এখানে নিয়ম নয়, পরিচিতিই শেষ কথা। লাইন আছে, কিন্তু মূল্য নেই। সকাল গড়ায়, পাম্প খুলে—কিন্তু শুরু হয় এক অন্য খেলা।
আবার লাইন ভেঙে, নিয়ম সরিয়ে, হঠাৎই কিছু মোটরসাইকেল ঢুকে পড়ে ভেতরে—নিঃশব্দে, নির্বিঘ্নে, নির্দ্বিধায়। যারা রাতভর অপেক্ষা করেছেন, তারা তাকিয়ে থাকেন—অবাক হয়ে, ক্ষোভে, অপমানে। আর যারা “পরিচিত”, তাদের জন্য যেন সব দরজা খোলা।
এক ভুক্তভোগীর কণ্ঠে হতাশার ভারী সুর— এখানে লাইনের কোনো দাম নেই… এখানে সিন্ডিকেট আছে। পরিচিত না হলে জ্বালানি পাওয়া যায় না। এই একটি বাক্য যেন পুরো বাস্তবতাকে নগ্ন করে দেয়।
তবে একটি কথা প্রতিবাদ মানেই ঝুঁকি- কেউ কেউ সাহস করে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু প্রশ্নের জবাব আসে না যুক্তিতে—আসে চোখ রাঙানি, হুমকি, এমনকি মারধরের চেষ্টা। ভিড়ের ভেতর উত্তেজনা জমে ওঠে, যেন আগুনের নিচে লুকিয়ে থাকা বারুদ। সৌভাগ্য যে, কিছু সচেতন মানুষ এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়—না হলে হয়তো সেই সকালই হয়ে উঠত রক্তাক্ত।
অন্যদিকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় প্রশাসন? সবচেয়ে রহস্যময়—দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা। তারা যেন ছিলেন, কিন্তু ছিলেন না। দেখেছেন, কিন্তু দেখেননি।
যেখানে প্রয়োজন ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সেখানে ছিল নীরবতা। যেখানে দরকার ছিল ন্যায্যতা, সেখানে দেখা গেছে বেছে বেছে প্রয়োগ করা নিয়ম। হঠাৎ করেই শুরু হয় কাগজপত্র যাচাই— লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস… কিন্তু অভিযোগ, এই নিয়ম যেন শুধু সাধারণ মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। আরেকদিকে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য— না কোনো প্রশ্ন, না কোনো বাধা।
অদৃশ্য সুবিধা, অদৃশ্য হিসাব- প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য— মিটার ছাড়াই জ্বালানি দেওয়া, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সরবরাহ, বোতল ও পাত্রে ভরে নেওয়া, লাইনের বাইরে বিশেষ সুবিধা। সবকিছু যেন চলছে এক অদৃশ্য ইশারায়, এক অঘোষিত ব্যবস্থায়।
অপেক্ষার শেষে অপমান- সাংবাদিক দল—যারা পুরো ঘটনা অনুসন্ধান করছিলেন— তারা নিজেরাও হয়ে পড়েন এই ব্যবস্থার শিকার। রাতভর অপেক্ষা…ভোর থেকে দুপুর…
তবুও এক ফোঁটা জ্বালানি নয়। শেষমেশ, হঠাৎ করে—
তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ১,৩০০ টাকার পেট্রোল,
আর বলা হয়— এখান থেকে চলে যান… আর কিছু লিখবেন না। এই অনুরোধ কি কেবল অনুরোধ? নাকি একটি চাপা সতর্কবার্তা?
সংকট না সিন্ডিকেট—প্রশ্নের মুখে পুরো ব্যবস্থা। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি জেলার সমস্যা নয়—এটি একটি ছড়িয়ে পড়া বাস্তবতা। সংকট যত বাড়ছে,ততই শক্তিশালী হচ্ছে প্রভাবশালী চক্র।আর সাধারণ মানুষ?
তারা দাঁড়িয়ে আছে লাইনে-সময় শ্রম আর সম্মান হারিয়ে।
ভুক্তভোগীদের দাবি- সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ, জ্বালানি বিতরণের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। সংশ্লিষ্টদের তদন্ত, ডিজিটাল টোকেন বা স্বচ্ছ সিরিয়াল ব্যবস্থা, প্রশাসনের জবাবদিহি।
শেষ প্রশ্ন—ন্যায্যতা কি কেবল গল্পই হয়ে থাকবে? রাতভর অপেক্ষা করা মানুষগুলোর চোখে এখন আর শুধু ক্লান্তি নেই— আছে প্রশ্ন, ক্ষোভ, আর একটুখানি ভাঙা বিশ্বাস।
জামালপুরের এই ঘটনা কেবল একটি ফিলিং স্টেশনের অনিয়ম নয়— এটি একটি আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রের নজরদারি, আর সাধারণ মানুষের অধিকার। এখন দেখার— এই আয়নায় তাকিয়ে সত্য স্বীকার করা হবে, নাকি সেটিকেও ঢেকে দেওয়া হবে আরেকটি নীরবতায়। এমন প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে নেটিজেনরা।
