শনিবার, ৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ, নিজের জীবন উৎসর্গ—স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৬, ২০২৬ ৫:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মাহেরীন চৌধুরী

জ্বলছে স্কুল ভবন, চারদিকে ধোঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখা। আতঙ্কে ছুটোছুটি করছে ছোট ছোট শিশুরা। কেউ কাঁদছে, কেউ সাহায্যের জন্য চিৎকার করছে। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে নিজের জীবন বাঁচানোর সুযোগ থাকলেও পিছু হটেননি শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী। সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন আগুনের মধ্যেই। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়েই রচনা করেন এক অনন্য আত্মত্যাগের গল্প।
সেই সাহসিকতা ও মানবিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

গত বছর ২১ জুলাই রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিদ্যালয় ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ভীত-সন্ত্রস্ত শিক্ষার্থীরা দিশেহারা হয়ে পড়ে।
তখন অক্ষত অবস্থায় ছিলেন শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরী। চাইলে অন্যদের মতো তিনিও নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। বরং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন আগুনের ভেতরে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে।
একজনের পর একজন করে শিশুদের বের করে আনতে থাকেন তিনি। তাঁর সেই প্রাণপণ প্রচেষ্টায় অন্তত ২০ জন শিশু সেদিন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে মায়ের কোলে ফিরে যেতে পেরেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগুনের ভয়াবহতায় গুরুতর দগ্ধ হন মাহেরীন নিজেই।

গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে ভর্তি করা হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসকরা জানান, তার শরীরের প্রায় ১০০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় সেদিন রাতেই জীবনের সঙ্গে লড়াই থেমে যায় এই সাহসী শিক্ষকের।
মৃত্যুর আগে হাসপাতালের শয্যায় স্বামী মনসুর হেলালের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলেন তিনি। মনসুর হেলাল তখন কাঁপা গলায় জানতে চেয়েছিলেন—সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি নিজে বেরিয়ে এলেন না, অন্তত নিজের দুই সন্তানের কথা ভেবেও তো আসতে পারতেন।
জবাবে মাহেরীন বলেছিলেন এক হৃদয়বিদারক কথা—
“ওরাও তো আমার সন্তান। ওদের একা রেখে আমি কী করে চলে আসি? আমি আমার সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি ওদের বাঁচাতে। এই কথাগুলো বলার কয়েক ঘণ্টা পরই রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

পরে তাকে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার আত্মত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র মানুষ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করেন এই সাহসী শিক্ষককে।

মাহেরীন চৌধুরীকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করার সিদ্ধান্তে আবেগাপ্লুত হয়েছেন তার স্বামী মনসুর হেলাল। তিনি বলেন, আমার স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষায় সরকারের এই পদক্ষেপের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তাকে মরণোত্তর যে সম্মান দেওয়া হচ্ছে, তাতে তার আত্মত্যাগ দেশের মানুষের কাছে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমার স্ত্রী নিজের জীবন উৎসর্গ করে কোমলমতি শিশুদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। এটি যেমন আমাদের পরিবারের জন্য গর্বের, তেমনি তাকে হারানোর বেদনাও অসীম। তার আদর্শই আমাকে ও আমাদের দুই ছেলেকে শক্তি দেয়।

মাহেরীন চৌধুরীর বাবা মহিতুর রহমান চৌধুরী নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খালাতো ভাই ছিলেন। যদিও মাহেরীনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়, তবু গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াতে তিনি নিয়মিত জলঢাকায় যেতেন।

এ বছর স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য সরকার মোট ১৫ জন ব্যক্তি ও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করেছে। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বৃহস্পতিবার জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
আগুনের ভেতর দাঁড়িয়ে যে শিক্ষক বলেছিলেন—“ওরাও তো আমার সন্তান”—তার সেই অমর ভালোবাসা আর সাহসই আজ তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।