রবিবার, ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিশু তুলিতে জেগে উঠল স্বাধীনতার গল্প,শিশুভাবনায় রঙিন ক্যানভাসে মূর্ত মুক্তিযুদ্ধ,

নিজস্ব প্রতিবেদক
ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬ ৭:৫৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে -ছবি: সংগৃহীত

সাপ্তাহিক ছুটির সকালের ঢাকাও যে কখনো কখনো স্বপ্নিল হয়ে ওঠে—তা বোঝা গেল আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে পা রাখলেই। ইট-পাথরের নীরস চত্বরটি এদিন আর শুধু একটি স্থাপনা ছিল না; সেটি রূপ নেয় এক বিশাল জীবন্ত ক্যানভাসে, যেখানে শত শত শিশুর রঙিন তুলিতে জেগে ওঠে স্বাধীনতার গল্প, আত্মত্যাগের ইতিহাস আর বিজয়ের উচ্ছ্বাস।

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের স্মরণে আয়োজিত শিশু-কিশোরদের এই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা যেন ইতিহাস আর নতুন প্রজন্মের মাঝে এক আবেগঘন সেতুবন্ধন। রোদঝলমলে সকালে কার্পেটের ওপর বসে শিশুরা ডুবে ছিল নিজের নিজের কল্পনার জগতে। কেউ আঁকছিল সবুজ বাংলার প্রকৃতি, কেউবা রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধ, কেউ আবার তুলে ধরছিল জাতীয় স্মৃতিসৌধকে—ভিন্ন ভিন্ন রঙে, ভিন্ন ভিন্ন অনুভবে।
চারপাশের প্যানেলে ঝুলছিল তাদেরই আঁকা ছবি। অভিভাবকদের স্নিগ্ধ উপস্থিতি আর শিশুদের উচ্ছ্বাসে পুরো প্রাঙ্গণ প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। এক কিশোরী গভীর মনোযোগে জলরঙে ফুটিয়ে তুলছিল জাতীয় স্মৃতিসৌধ—তার তুলির আঁচড়ে স্মৃতিসৌধের পাদদেশে পতাকাবাহী জনতার ঢল, যেন বিজয়ের আনন্দ ছুটে আসছে ক্যানভাস ছাপিয়ে। অন্যদিকে, উজ্জ্বল কমলা আর হলুদের আবহে উদীয়মান রক্তিম সূর্যের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতিসৌধ—এক শিশুর ছবিতে যেন নতুন দিনের প্রতিশ্রুতি।

প্রতিযোগিতা প্রাঙ্গণের প্রতিটি দৃশ্যই বলে দিচ্ছিল শিশুদের আগ্রহ আর আবেগের কথা।
প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণে মুখর ছিল আয়োজন। শিশু ও কিশোর—এই দুই বিভাগে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় মোট ১৮টি পুরস্কার। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের পাশাপাশি দেওয়া হয় বিশেষ পুরস্কারও। এ ছাড়া শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয় আরো পাঁচটি সম্মাননা। তবে এ আয়োজন কেবল পুরস্কারের প্রতিযোগিতা ছিল না—ছিল শেখার এক অনন্য আসর। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল বারক আলভী শিশুদের উদ্দেশে বলেন,
“ভালো ছবি আঁকতে হলে আগে মন দিয়ে দেখতে শিখতে হবে। নিজের মতো করে আঁকলেই ছবিতে প্রাণ আসে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বারবার চেষ্টার মধ্য দিয়েই একদিন খুদে শিল্পী হয়ে ওঠে বড় শিল্পী।

টানা ২৭ বছর ধরে এই চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, এটি শুধু ছবি আঁকার কর্মসূচি নয়—এটি একজন দেশপ্রেমিক বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন। শিশুদের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান,
“তোমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। যারা এই স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মরণ করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

অনুষ্ঠানে নগরজীবনের যান্ত্রিকতার কথাও উঠে আসে। শিল্পী মনিরুজ্জামান অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিশুদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিতে হবে।
“ইটপাথরের শহর থেকে মাসে অন্তত একবার তাদের গ্রামে নিয়ে যান। দিগন্তজোড়া মাঠ, নদী আর পাহাড় দেখলে প্রশ্ন জাগবে, সেখান থেকেই জন্ম নেবে দেশপ্রেম।”
শহীদ পরিবারের সদস্য নাজনীন হক বলেন, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চাই শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ করে তোলে। তাঁর মতে, সৃজনশীলতাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ শক্তি।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিল্পী অশোক কর্মকার, শহীদ পরিবারের সদস্য অধ্যাপক মাইনুল হক। সঞ্চালনায় ছিলেন কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম।
দিনের শেষে জাদুঘরের দেয়ালে ঝোলানো শিশুদের আঁকা ছবিগুলো হালকা বাতাসে দোল খাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল—এই শিশুরাই তো আগামীর বাংলাদেশ। তাদের তুলির আঁচড়েই একদিন মুছে যাবে সব অন্ধকার, ফুটে উঠবে এক অনাবিল সুন্দর সকাল।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এই প্রাঙ্গণ তাই শুধু একটি অনুষ্ঠানস্থল নয়—এ যেন সুন্দর আগামীর এক নীরব আঁতুড়ঘর।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।