বই থেকে দূরে, খেলাধুলায় অনাগ্রহ, রাতজাগা আর ভার্চুয়াল জগতে আসক্তি—প্রশ্ন উঠছে তরুণদের জীবনযাপন, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি নিয়ে। প্রতীকী ফটো
এক হাতে স্মার্টফোন, চোখ পর্দায়, কানে হেডফোন—চারপাশে কী ঘটছে, সেদিকে যেন কোনো খেয়ালই নেই। পাশেই পড়ে আছে বই, মাঠে চলছে খেলা, জানালার বাইরে ফুটে উঠছে নতুন দিনের আলো; অথচ তার মন পড়ে আছে ভার্চুয়াল জগতের অসীম স্ক্রলিংয়ে। রাত গভীর হলে অনলাইন উপস্থিতি বাড়ে, আর সকাল হলে ঘুমের চাদরে ঢাকা পড়ে দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এ কি কেবল সময়ের পরিবর্তন, নাকি জীবনযাপনের গভীরে জমে ওঠা কোনো সংকট? বর্তমান প্রজন্মের একটি অংশের অভ্যাস, আচরণ ও মানসিকতা নিয়ে এমন প্রশ্ন এখন ক্রমেই সামনে আসছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি তাদের হাতে এনে দিয়েছে অসংখ্য সুযোগ। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই যদি হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান নিয়ন্ত্রক, তবে জ্ঞান, দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার বিকাশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
লক্ষ্য আছে, নাকি শুধু তাৎক্ষণিক আনন্দের পেছনে ছোটা?
জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা আর সেই স্বপ্ন পূরণে প্রতিদিন পরিশ্রম করা এক বিষয় নয়। বর্তমান তরুণদের একটি অংশের মধ্যে তাৎক্ষণিক আনন্দ, দ্রুত সাফল্য ও সহজ বিনোদনের প্রতি প্রবল আকর্ষণ দেখা যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ, নিয়মিত অনুশীলন, ব্যর্থতা মেনে নেওয়া এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেকেই পিছিয়ে থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে বিচার করার প্রবণতাও বাড়ছে। কেউ দামি ফোন, কেউ বিদেশ ভ্রমণ, কেউ বিলাসী জীবনযাপনের ছবি তুলে ধরছে। সেই চাকচিক্যের সঙ্গে নিজের বাস্তবতার তুলনা করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে হতাশা, হীনম্মন্যতা ও অস্থিরতা।
অথচ জীবনের প্রকৃত সাফল্য শুধু দৃশ্যমান অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা তৈরি, দায়িত্ব পালন, সততা ধরে রাখা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও স্থির থাকার ক্ষমতাই একজন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নেয়। সেই প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ—যে গুণগুলো এক দিনে অর্জন করা যায় না।
বইয়ের পাতা থেকে দূরে, জ্ঞানের গভীরতা থেকেও কি দূরে?
একসময় অবসর মানেই ছিল বই পড়া, পত্রিকা হাতে নিয়ে দিনের খবর জানা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সাহিত্য, রাজনীতি, ইতিহাস ও সমাজ নিয়ে আলোচনা। এখন অনেকের অবসর কাটে ছোট পর্দায় ছোট ছোট ভিডিও দেখতে দেখতে। কয়েক সেকেন্ডের বিনোদন, মুহূর্তের উত্তেজনা আর একের পর এক নতুন কনটেন্টের ভিড়ে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাস দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
কতজন তরুণ নিয়মিত বই পড়ে? কতজন দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন কিংবা বিশ্বসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী? কতজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ কিংবা সুফি কবি সাদী, রুমি ও হাফিজের সাহিত্য পড়ার সময় বের করে?
সব তরুণকে একই মানদণ্ডে বিচার করা অবশ্যই অন্যায্য। অনেক তরুণই বই পড়ছেন, গবেষণা করছেন, সাহিত্যচর্চা করছেন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছেন। তবু বিনোদনের সহজলভ্যতা যদি পাঠাভ্যাসকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দেয়, তবে তা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
কারণ বই কেবল তথ্য দেয় না; বই মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, ভিন্নমত বুঝতে শেখায়। যে সমাজের তরুণেরা গভীরভাবে পড়ার ও চিন্তা করার অভ্যাস হারায়, সে সমাজে বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও যুক্তিবোধের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মাঠের বদলে মোবাইল, শরীরচর্চার বদলে বসে থাকা
একসময় বিকেল হলেই পাড়া-মহল্লার মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন কিংবা নানা দেশীয় খেলায় মেতে উঠত কিশোর-তরুণেরা। বৃষ্টিতে ভেজা, কাদামাটিতে খেলতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, গাছে ওঠা, নদীতে সাঁতার শেখা—এসব ছিল শৈশব ও কৈশোরের পরিচিত অভিজ্ঞতা।
এখন অনেক জায়গায় মাঠের সংকট, নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব, যানজট, পড়াশোনার চাপ এবং অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণে বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন গেম, ভিডিও স্ট্রিমিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণ।
ফলে দিনের বড় একটি অংশ বসে কাটানোর প্রবণতা বাড়লে শারীরিক সক্ষমতা, ঘুমের নিয়ম, মানসিক সতেজতা ও সামাজিক মেলামেশায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, খেলাধুলা কিংবা শরীরচর্চা শুধু শরীর সুস্থ রাখে না; এগুলো দলগত কাজ, নেতৃত্ব, নিয়ম মানা এবং হার-জিতকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার শিক্ষাও দেয়।
আধা কিলোমিটার পথও হেঁটে যেতে অনীহা, সামান্য শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা কিংবা সামান্য অপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা—এসব আচরণ সব তরুণের ক্ষেত্রে সত্য নয়। তবে যেখানে এমন প্রবণতা রয়েছে, সেখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে: প্রযুক্তিনির্ভর জীবন কি আমাদের শারীরিক ও মানসিক সহনশীলতাকে সংকুচিত করছে?
আচরণে শিষ্টাচার কোথায়, শ্রদ্ধাবোধই বা কতটা?
একটি প্রজন্মের মূল্যবোধ বোঝার জন্য শুধু তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেখলেই চলে না; দেখতে হয় অন্য মানুষের সঙ্গে তার আচরণ কেমন।
গণপরিবহনে বয়স্ক ব্যক্তি, অসুস্থ মানুষ কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীর জন্য আসন ছেড়ে দেওয়া, কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগলে দুঃখ প্রকাশ করা, ভুল করলে তা স্বীকার করা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলা—এসব ছোট আচরণই সামাজিক শিষ্টাচারের পরিচয় বহন করে।
কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিজের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অন্যের অসুবিধা বিবেচনা করা হচ্ছে না। কথোপকথনে ধৈর্য কম, মতভেদে সহনশীলতা কম, আর সামান্য সমালোচনাতেই প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্ক-বিতর্কও কখনো কখনো বাস্তব জীবনের আচরণে প্রভাব ফেলছে।
বয়সে বড় হলেই যে কেউ সব বিষয়ে সঠিক হবেন, তা নয়। আবার বয়সে ছোট হলেই কারও মতামত গুরুত্বহীন হয়ে যায় না। প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, যুক্তির ভিত্তিতে কথা বলা এবং মতের অমিল থাকলেও শালীনতা বজায় রাখা।
শ্রদ্ধাবোধ মানে অন্ধ আনুগত্য নয়; শ্রদ্ধাবোধ মানে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। এই শিক্ষা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশ থেকে না এলে শুধু পাঠ্যবইয়ের নীতিকথা দিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
রাত জাগা, দিনের আলো হারানো
রাতভর অনলাইনে থাকা, ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করা এবং সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা—অনেক তরুণের জীবনযাপনে এমন চিত্র দেখা যায়। রাতের পর রাত ঘুমের সময় পিছিয়ে গেলে পড়াশোনা, কর্মদক্ষতা, মনোযোগ ও দৈনন্দিন রুটিনে প্রভাব পড়তে পারে।
সমস্যা শুধু রাত জাগা নয়; সমস্যা হলো ঘুম, কাজ, বিশ্রাম ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা। প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে অনবরত স্ক্রল করা, গুরুত্বপূর্ণ সময়েও ফোন থেকে মন সরাতে না পারা কিংবা অনলাইনে অন্যের প্রতিক্রিয়ার ওপর নিজের মেজাজ নির্ভর করতে দেওয়া—এসব অভ্যাস আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে আনে।
প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়। অনলাইনেই শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ যখন নিজের হাতে থাকে না, তখন উপকারী মাধ্যমটিই সময় ও মনোযোগের বড় অংশ গ্রাস করতে পারে।
দক্ষতার যুগে একমাত্র দক্ষতা কি স্ক্রলিং?
বর্তমান বিশ্বে দক্ষতা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে জানা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রযুক্তির পর্দায় দ্রুত আঙুল চালানো আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা এক বিষয় নয়।
একজন তরুণ স্মার্টফোনে দক্ষ হতে পারেন, কিন্তু তাঁকে একই সঙ্গে যোগাযোগ, ভাষা, বিশ্লেষণ, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান, সময় ব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। বাস্তব জীবনের কাজ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, খেলাধুলা, ভ্রমণ, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও স্বেচ্ছাসেবার অভিজ্ঞতা এসব দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
শুধু অনলাইন তথ্যের ওপর নির্ভর করে সব জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে, ভুল থেকে শিখতে এবং ব্যর্থতার পর আবার শুরু করতে শেখায়।
পাহাড়ে ওঠা কিংবা সাগর পাড়ি দেওয়া প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য হতে হবে, এমন নয়। কিন্তু নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার মানসিকতা, পরিশ্রমের অভ্যাস এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ থাকা জরুরি। কারণ আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় শুধু অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও দেখে নয়; নিজের চেষ্টা, অনুশীলন ও অর্জনের মধ্য দিয়ে।
উপদেশ শুনতে অনীহা, কিন্তু মতামত দিতে আগ্রহ বেশি?
তথ্যের সহজলভ্যতা মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন যে কেউ পৃথিবীর নানা প্রান্তের ঘটনা জানতে পারেন, বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শুনতে পারেন এবং নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর তথ্যের সত্যতা যাচাই করা এক বিষয় নয়।
কোনো বিষয়ে সামান্য তথ্য জেনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া, অন্যের বক্তব্য না শুনে তর্ক শুরু করা কিংবা নিজের ভুল স্বীকার করতে না চাওয়ার প্রবণতা জ্ঞানচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জ্ঞানী মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি জানেন, তাঁর জানারও সীমা আছে। কখন কথা বলতে হবে, কখন মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, কখন প্রশ্ন করতে হবে এবং কখন নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে হবে—এই বোধই প্রকৃত পরিপক্বতার পরিচয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করাই যথেষ্ট নয়। যুক্তি দিয়ে ভাবা, ভিন্নমতকে সম্মান করা, তথ্য যাচাই করা এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবেশও প্রয়োজন। একইভাবে পরিবারে শিশু-কিশোরদের শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়, তাদের কথা শোনার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।
এই প্রজন্ম কি সত্যিই এতটা হতাশাজনক?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বর্তমান প্রজন্মকে লক্ষ্যহীন, মূল্যবোধহীন কিংবা অযোগ্য বলে এককথায় বাতিল করে দেওয়া কি ন্যায়সংগত?
না। এই প্রজন্মের অনেক তরুণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন উদ্যোগ গড়ে তুলছেন, গবেষণা করছেন, উদ্যোক্তা হচ্ছেন, স্বেচ্ছাসেবায় অংশ নিচ্ছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কাজ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাদের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে।
তবে এটাও সত্য, প্রযুক্তিনির্ভরতা, মনোযোগের সংকট, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং অনলাইন তুলনার চাপ নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। এসব সমস্যাকে প্রজন্মের জন্মগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে জীবনযাপনের পরিবর্তন, সামাজিক বাস্তবতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে বোঝা জরুরি।
তরুণদের সামনে যখন কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতার চাপ, মানসিক চাপ, নিরাপদ বিনোদনের অভাব এবং পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা একসঙ্গে উপস্থিত হয়, তখন তাদের সমস্যাগুলোকে শুধু অলসতা বা অবাধ্যতা বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রয়োজন তাদের কথা শোনা, বাস্তব সুযোগ তৈরি করা এবং দায়িত্বশীল আচরণের জন্য সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।
পরিবর্তনের দায়িত্ব কার?
প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। শিশু-কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত ঘুম, খেলাধুলা, ঘরের কাজে অংশগ্রহণ এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের চর্চা জরুরি। বড়দের নিজেদের আচরণেও সেই শিক্ষার প্রতিফলন থাকতে হবে।
দ্বিতীয় দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, দলগত কাজ, শারীরিক সক্ষমতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে। খেলাধুলা, বিতর্ক, পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
তৃতীয় দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের। খেলার মাঠ, পাঠাগার, নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। তরুণদের কাছে দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করতে হলে দায়িত্ব পালনের উপযোগী সুযোগও তৈরি করতে হবে।
আর তরুণদের নিজেদেরও কিছু প্রশ্ন করতে হবে—দিনের কতটা সময় আমি ফোনে কাটাই? গত এক মাসে নতুন কী শিখেছি? নিয়মিত শরীরচর্চা করছি কি? পরিবারের বাইরে সমাজের জন্য কী করছি? কোনো ভুল হলে তা স্বীকার করতে পারি কি? আমার পাঁচ বছরের লক্ষ্য কী, আর আজকের কাজগুলো সেই লক্ষ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আত্মসমালোচনার শুরু হতে পারে।
শেষ কথা: প্রজন্মকে দোষ নয়, জাগাতে হবে সম্ভাবনা
একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না শুধু তার হাতে থাকা প্রযুক্তি দিয়ে; নির্ধারিত হয় সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য, চিন্তার গভীরতা, কাজের অভ্যাস এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়ে।
স্মার্টফোন থাকবে, ইন্টারনেট থাকবে, অনলাইন বিনোদনও থাকবে। কিন্তু বইয়ের পাতার সঙ্গে সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, মাঠের উচ্ছ্বাস, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান এবং নিজের লক্ষ্যের জন্য নিরলস পরিশ্রম—এসব যেন হারিয়ে না যায়।
তরুণদের শুধু উপদেশ দিলে হবে না; তাদের সামনে উদাহরণ তৈরি করতে হবে। শুধু সমালোচনা করলে হবে না; তাদের জন্য সুযোগও তৈরি করতে হবে। আবার সুযোগ পাওয়ার পর নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
কারণ একটি প্রজন্মকে বিচার করার সবচেয়ে ভালো উপায় তার দুর্বলতার তালিকা তৈরি করা নয়; বরং তার সম্ভাবনাকে কতটা বিকশিত করা গেল, তা দেখা।
আজকের তরুণের হাতেই আগামী দিনের সমাজ, রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের দায়িত্ব। তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয়—এই প্রজন্ম কোথায় যাচ্ছে? প্রশ্ন হলো, তাদের সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ কতটা প্রস্তুত?
উত্তর খুঁজতে হলে এখনই ফিরতে হবে বইয়ে, খেলাধুলায়, মানবিকতায়, শৃঙ্খলায় এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনে। স্ক্রিনের আলো যেন জীবনের আলোকে ঢেকে না দেয়—এই হোক সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রত্যাশা।
