রবিবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হাজারো বেকার তরুণের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি, প্রশ্নফাঁস চক্রের কেন্দ্রে সুজিত গোপ

স্টাফ রিপোর্টার
অক্টোবর ১৭, ২০২৬ ১১:২৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফাইল ছবি

সরকারি চাকরির স্বপ্ন নিয়ে দিনের পর দিন প্রস্তুতি নেওয়া হাজারো বেকার তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপ—এমন তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

অভিযোগ অনুযায়ী, একের পর এক সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে প্রার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ার মূল সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতেন সুজিত গোপ। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চক্রে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ একাধিক স্তরের সহযোগী সক্রিয় ছিলেন। অনুসন্ধানে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে সুজিত গোপ ও তাঁর সহযোগীদের নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে চক্রের একাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হলেও সুজিত গোপ এখনো গ্রেপ্তার হননি। তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ। তাঁকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে প্রশ্নফাঁসের উৎস, অর্থের লেনদেন এবং চক্রের পেছনে অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মদদদাতা রয়েছেন কি না, তা উদ্‌ঘাটনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

সুজিত গোপের সঙ্গে সক্রিয় সহযোগীরা

অনুসন্ধান ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সুজিত গোপের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে প্রশ্নফাঁসের নেটওয়ার্ক সচল রাখতেন একাধিক সহযোগী। প্রশ্ন ও উত্তর সংগ্রহ, তা বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের মধ্যে।

প্রশ্ন ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রাথমিক ধাপে সরাসরি কাজ করতেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী আসাদুল হাবিব, একটি ট্যাক্স ফার্মের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিম্নমান সহকারী বা পেশকার জাহাঙ্গীর আলম এবং চক্রের অন্যতম সদস্য এস এম এমদাদুল রহমান।

অভিযোগ অনুযায়ী, মতিঝিল এলাকায় পরীক্ষাকেন্দ্র পড়া প্রার্থীদের গোপন বুথে বসিয়ে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানোর কাজ সরাসরি পরিচালনা করতেন এস এম এমদাদুল রহমান। এভাবে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ও উত্তর প্রার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ত বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কে

প্রাথমিক পর্যায়ে সুজিত গোপ ও তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে যেত চক্রের পরবর্তী স্তরের সদস্যদের হাতে। এই পর্যায়ে প্রশ্ন সংগ্রহ ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফি এবং হাসিনুর রহমান সুজন।

তাঁদের কাছ থেকে প্রশ্ন পৌঁছাত পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোহাম্মদ রুবেল ইসলামের কাছে। এরপর রুবেল ইসলামের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করতেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকির।

সোহাগ ফকিরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশ্ন ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও ৩৬তম বিসিএস কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে। এই স্তরে আরও সক্রিয় ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক মো. রাফিউল ইসলাম এবং ভারতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরি প্রসাদ রায়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, মিরপুরের কালশী রোডের একটি গোপন বুথে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করানোর দায়িত্বে ছিলেন মো. রাফিউল ইসলাম। ফলে প্রশ্নফাঁসের নেটওয়ার্ক শুধু প্রশ্ন সংগ্রহ ও বিতরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তর পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে চক্রের সন্ধান

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর অনুসন্ধানে সুজিত গোপকেন্দ্রিক এই চক্রের তথ্য সামনে আসে।

মামলার তদন্ত ও অনুসন্ধানের সূত্র ধরে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, হাসিনুর রহমান সুজন, এস এম এমদাদুল রহমান, আসাদুল ইসলাম, নূর মোহাম্মদ এবং জাহাঙ্গীর আলম।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রশ্নফাঁসের নেটওয়ার্কের বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে অনুসন্ধান চলছে। তবে চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।

মূল হোতাকে গ্রেপ্তারে অভিযান

প্রশ্নফাঁস চক্রের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে অভিযুক্ত সুজিত গোপকে গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে প্রশ্নফাঁসের পুরো প্রক্রিয়া, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন কীভাবে চক্রের হাতে পৌঁছাত, কারা অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন সংগ্রহ ও বিতরণ করত এবং এর পেছনে আরও কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ শুধু অনিয়মের বিষয় নয়; এটি যোগ্য প্রার্থীদের ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ নষ্ট করে তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তোলে। তাই সুজিত গোপসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রশ্নফাঁসের অর্থনৈতিক লেনদেন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।