স্ত্রী ও শিক্ষার্থী ছেলের নামেও কোটি কোটি টাকার সম্পদ—ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেন, সম্পত্তি ক্রোক ও হিসাব ফ্রিজ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দীন মহারাজ এবং তার পরিবারের সম্পদ কেলেঙ্কারি। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে মহারাজ, তার স্ত্রী উম্মে কুলসুম এবং ছেলে শাম্মাম জুনাইদ ইফতির বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দায়ের করা এসব মামলায় প্রায় ৫১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—মাত্র কয়েক কোটি টাকার বৈধ আয়ের বিপরীতে এক দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদের সাম্রাজ্য।
১২ বছরে সম্পদের পাহাড়
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মহিউদ্দীন মহারাজ নিজের নামে ১২২টি দলিলে জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, মার্কেট ও দোকান ক্রয় করেছেন।
দুদকের হিসাবে এসব স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ২৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
এছাড়া তার নামে রয়েছে—
বিভিন্ন ব্যাংকে বড় অঙ্কের সঞ্চয়
ব্যবসায় বিনিয়োগ
বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার
দুটি বিলাসবহুল গাড়ি
এসব অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে তার মোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
অন্যদিকে একই সময়ে পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
ফলে সম্পদ ও ব্যয়ের মোট হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
আয়ের উৎস মাত্র ৩ কোটি!
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই বিপুল সম্পদের বিপরীতে মহিউদ্দীন মহারাজের গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
অর্থাৎ প্রায় ৫১ কোটি ২৭ লাখ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, এই অর্থের বড় অংশ অবৈধ উপায়ে অর্জিত এবং পরে ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ব্যাংক লেনদেনে মিলল সন্দেহজনক অঙ্ক
দুদকের তদন্তে মহিউদ্দীন মহারাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলোতে বিপুল অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে—
প্রায় ৫৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা জমা
বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ৫৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা স্থানান্তর
দুদকের মতে, এসব অর্থের বড় অংশ বিভিন্ন বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক লেনদেনের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মানিলন্ডারিংয়ের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
স্ত্রীর নামেও কোটি টাকার সম্পদ
মহিউদ্দীন মহারাজের স্ত্রী উম্মে কুলসুমের বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা করেছে দুদক।
তদন্তে দেখা গেছে, তার নামে রয়েছে—
জমি, ফ্ল্যাট ও দোকানসহ প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ
ব্যাংক সঞ্চয় ও বিনিয়োগসহ প্রায় ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ
সব মিলিয়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
পারিবারিক ব্যয়সহ হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি ৫ লাখ টাকা।
কিন্তু তার বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ২ কোটি ৬ লাখ টাকা।
ফলে প্রায় ৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তার নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে, যা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষার্থী ছেলের নামেও সম্পদের ছড়াছড়ি
মহিউদ্দীন মহারাজের ছেলে শাম্মাম জুনাইদ ইফতির বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, তার নামে রয়েছে—
জমি ও দোকানসহ প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ
ব্যাংক সঞ্চয় ও বিনিয়োগসহ প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ
পারিবারিক ব্যয়সহ মোট হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
কিন্তু তার বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
ফলে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
দুদক বলছে, শিক্ষার্থী হওয়ার পরও তার নামে সম্পদ থাকা অস্বাভাবিক, তাই ধারণা করা হচ্ছে—মহারাজের অবৈধ অর্থ ছেলের নামে দেখিয়ে বৈধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সম্পত্তি ক্রোক, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ
দুদক জানিয়েছে, পিরোজপুরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের নির্দেশে মহিউদ্দীন মহারাজ ও তার পরিবারের নামে থাকা বিভিন্ন সম্পত্তি ইতোমধ্যে ক্রোক (জব্দ) করা হয়েছে।
একই সঙ্গে তাদের নামে থাকা একাধিক ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে, যাতে তদন্ত চলাকালে সম্পদ বিক্রি বা স্থানান্তর করা না যায়।
এলজিইডি প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অভিযোগ
দুদক সূত্রে জানা গেছে, মহিউদ্দীন মহারাজের বিরুদ্ধে এর আগেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)-এর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
অভিযোগ রয়েছে—টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে কাজ না করেই প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের।
এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আরও আটটি মামলা রয়েছে, যেগুলোর তদন্ত এখনো চলমান।
সামনে কী হতে পারে
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত শেষে দুদক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলে শুরু হবে বিচারিক প্রক্রিয়া।
যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে দুর্নীতি দমন আইন ও মানিলন্ডারিং আইনের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের মতো কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন অভিযুক্তরা।
