সরকারি দপ্তরটি হওয়ার কথা ছিল প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র। অথচ অভিযোগ উঠেছে— প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এখন পরিণত হয়েছে নিয়োগ-টেন্ডার বাণিজ্যের ‘অভয়ারণ্য’তে।
অভিযোগের কেন্দ্রে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা. আবু সুফিয়ান। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি প্রভাবশালী বলয়—যা নাকি এখন দপ্তরের নিয়োগ, প্রকল্প ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের একাংশের।
নিয়োগে ৫ কোটি টাকার লেনদেন? সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৬০০ কর্মচারী নিয়োগ ঘিরে ওঠে তোলপাড়। অভিযোগ অনুযায়ী— পরিচালক প্রশাসন ও উপপরিচালকের নেতৃত্বে নিয়োগ বোর্ডে “সম্মানী ভাতা” নামে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোপাট। বোর্ড সদস্যপ্রতি দিনে প্রায় ১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক নিয়োগে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ, এমনকি এক উপপরিচালকের ব্যক্তিগত গাড়িচালককেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তুঙ্গে। দপ্তরের ভেতরের একটি বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, “নিয়োগ বোর্ড ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা—মূল সিদ্ধান্ত হতো বাইরে।
এদিকে ২১ কোটি টাকার ভ্যাকসিন প্রকল্পে অনিয়মের ও অভিযোগ রয়েছে। ক্ষুরারোগ নির্মূল ও পিপিআর ভ্যাকসিন ক্রয় প্রকল্পে ২১ কোটি টাকার দুর্নীতি নিয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশের কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নথি চাইলেও তা জমা না দেওয়ার অভিযোগ, তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে—এমন দাবি কর্মকর্তাদের একাংশের।
আবার জাতীয় প্রাণিসম্পদ মেলায় ‘৪ কোটি টাকার বাণিজ্য’? গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রাণিসম্পদ মেলাকে ঘিরেও ওঠে গুরুতর অভিযোগ।
সূত্র বলছে— মেলা আয়োজনের বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বিল, স্টল বরাদ্দ ও সরবরাহে সিন্ডিকেট। এতে ডিজি, প্রশাসনিক পরিচালক ও উপপরিচালকের যোগসাজশে প্রায় ৪ কোটি টাকা হাতবদলের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগে উৎপাদন পরিচালক ও খামার শাখার এক কর্মকর্তার সহায়তার কথাও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনিক বলয়ে ‘রাজনৈতিক বিভাজন’ দপ্তরের ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভাজনের অভিযোগও সামনে এসেছে। একাংশ কর্মকর্তার দাবি—বিরোধী মতের কর্মকর্তারা কোণঠাসা। দীর্ঘদিন পদায়নে থাকা কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয়ের আড়ালে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে “সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ” রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ।
পরিচালক-উপপরিচালক জোট—দপ্তরে ‘ক্ষমতার ত্রিভুজ’?
অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন— প্রশাসনিক পরিচালক ডা. বয়জার রহমান, উপপরিচালক ডা. তারেক হোসেন
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই দুজনকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক বলয়, যা নিয়োগ-টেন্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ন্ত্রণ করে।
কর্মকর্তাদের ক্ষোভ: পরিবর্তন হলেও অবস্থার বদল হয়নি, দীর্ঘদিন বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ— দুর্নীতি ও প্রভাবের চক্র ভাঙা না গেলে দক্ষ কর্মকর্তারা নেতৃত্বে আসতে পারবেন না। তাদের দাবি, বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা করছেন তারা।
উল্লেখ্য শেষমেশ প্রাণিসম্পদ খাত দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু অভিযোগগুলো সত্য হলে— এটি শুধু একটি দপ্তরের সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কর্কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও কোনো জবাব মেলেনি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো রেসপন্স করছেন না। বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
