একদিকে গ্রামের দরিদ্র মসলা ব্যবসায়ীর পরিবার, অন্যদিকে কয়েক বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিকানা—এই বিস্ময়কর রূপান্তর ঘিরে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম (কাঁকন)-এর বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।
সূত্রের দাবি, চাকরিজীবনের অল্প সময়েই তিনি প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার শ্রীরামগাতি গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলামের বাবা মহির উদ্দিন স্থানীয় হাট-বাজারে ধনিয়া, জিরা, আদা, হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ-রসুনসহ মসলা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। হাটের দিন বাদে ফেরি করেও জীবিকা নির্বাহ করতেন। সেই আয় দিয়েই দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলে শহিদুলকে লেখাপড়া করিয়েছেন বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য।
প্রায় ১২-১৩ বছর আগে এনবিআরে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই নাকি বদলে যেতে শুরু করে পরিবারের ভাগ্যচিত্র। এলাকাবাসীর দাবি, ধীরে ধীরে শহিদুল ইসলাম হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী কর্মকর্তা—যদিও পদমর্যাদায় খুব উচ্চপদে নন। তাদের অভিযোগ, “আঙুল ফুলে কলাগাছ” হওয়ার মতো দ্রুত সম্পদের বিস্তার ঘটে তার।
শত বিঘার বেশি জমি, মেহগনি বাগান, ডেইরি ফার্ম
গ্রামে অনুসন্ধানে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, শহিদুল ইসলাম নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় শত বিঘার বেশি জমি কিনেছেন। নির্মাণ করছেন বিশাল ডেইরি ফার্ম। বাড়ির পাশেই প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকায় জমিসহ একটি বড় মেহগনি বাগান কেনার কথাও শোনা যায়। তার গ্রামীণ বাড়িটিও এখন দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় পরিণত হয়েছে বলে জানান অনেকে।
এছাড়া ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট ও গাড়ি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সূত্রের দাবি—যার অনুসন্ধান চলছে এবং পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে কথিত ঘটনা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন বন্দরে দায়িত্ব পালনকালে চোরাকারবারিদের সঙ্গে শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। কমিশনের বিনিময়ে পাচারকৃত পণ্য পারাপারে সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গ্রামের এক মুরুব্বির দাবি, একবার ১০ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানে সহযোগিতার ঘটনায় তিনি ধরা পড়েছিলেন—এমন কথা গ্রামে প্রচলিত রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ মেলেনি।
অভিযোগ অস্বীকার-অভিযোগের বিষয়ে জানতে শহিদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে রাজশাহীতে তার কর্মস্থলে গিয়ে মতামত জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এগুলো আমার নয়, আমার পরিবারের সম্পত্তি।”
পরে বাবার আর্থিক অবস্থার প্রসঙ্গ তুললে তিনি এ বিষয়ে আর মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চাপের অভিযোগ–অনুসন্ধানী টিমের দাবি, রাজশাহীতে তার কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ঢাকা থেকে কয়েকজন সাংবাদিক নেতা ফোন করে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। যদিও এ অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
শহিদুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা হবে এক বিস্ময়কর উত্থানের অন্ধকার দিকের উন্মোচন; আর প্রমাণিত না হলে—একজন সরকারি কর্মকর্তার সুনাম রক্ষায়ও প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত।
