মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করতে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সর্বস্তরের জনতা। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ফুলের শ্রদ্ধায় ঢেকে যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল শহীদ বেদি। ছবি: সংগৃহীত
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির প্রতীক সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সর্বস্তরের জনতা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ফুলের শ্রদ্ধায় ঢেকে যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল শহীদ বেদি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন সংগঠন ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা হাতে ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে আসছেন বীর সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে যায় শহীদ বেদি। একইসঙ্গে দলে দলে ফুল হাতে নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে প্রবেশ করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এর আগে, ভোর ৬টার দিকে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এসময় বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করেন। তখন বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতাসহ উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে দলীয় প্রধান হিসেবে স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় মন্ত্রিপরিষদের পক্ষেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মার শান্তি এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে দোয়া, মোনাজাত করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন এবং সেখানে উপস্থিত বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে কুশল বিনিময় করেন।
মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল অন্যান্য আইন কর্মকর্তাদের নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এসময় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের নেতৃত্বে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা জানানো হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানে ইউজিসি’র সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনসহ ইউজিসি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মাকছুদুর রহমান ভূঁইয়াসহ অন্যান্য বিভাগের পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক এবং ইউজিসি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ও কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাসহ কমিশনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের সূচনালগ্নে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। আজ বৃহস্পতিবার ভোর সোয়া ৬টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে আসেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মানুষের হাতে ছিল ফুল, হৃদয়ে ছিল কৃতজ্ঞতা আর চোখে ছিল ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। তাদের পদচারণায় সৌধ প্রাঙ্গণ পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
স্মৃতিসৌধ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শিশু থেকে বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী থেকে কর্মজীবী, সাধারণ মানুষ থেকে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা সারিবদ্ধভাবে এক স্রোতে মিশে গিয়ে স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার পর শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেও কারো মুখে ক্লান্তি দেখা যায়নি। হাতে লাল-সবুজের পতাকা, কেউবা মাথায় জাতীয় পতাকার ব্যান্ড পরে, আবার কেউ পরিবারের ছোটদের নিয়ে ইতিহাসের এই গৌরবময় দিনটি স্মরণ করে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এসেছেন।
চারপাশে ভেসে আসছে দেশাত্মবোধক গান, আর সেই সুরের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে মানুষের পদচারণায় মুখরিত পুরে সৌধ এলাকা। নানা বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে পুরো স্মৃতিসৌধ এলাকা যেন একখণ্ড লাল-সবুজের প্রান্তরে পরিণত হয়েছে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অনেকেই নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছেন কিছুক্ষণ, কেউ কেউ শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন, আবার কেউ উচ্চারণ করেছেন স্বাধীনতার চেতনা ধরে রাখার অঙ্গীকার। এই উপস্থিতি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মূল্যবোধ বহন করার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বীর শহিদদের প্রতি এই সম্মান, এই ভালোবাসা এবং এই সম্মিলিত উপস্থিতিই যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়। এই দেশ রক্তে অর্জিত, আর সেই আত্মত্যাগ কখনো ভোলার নয়।
এদিন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকেও স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে এবং স্মৃতিসৌধের মূল বেদি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। এ সময় সবার চোখে মুখে শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার ছাপ।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল আজকের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। মাথায় জাতীয় পতাকার ব্যান্ড এবং গায়ে লাল-সবুজ পোশাক পরে অসংখ্য শিশুকে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে স্মৃতিসৌধে আসতে দেখা গেছে। তারা হাতে ছোট ছোট জাতীয় পতাকা নিয়ে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে এবং বিজয়ের আনন্দে মেতে উঠছে। পতাকা হাতে শিশুদের উচ্ছল হাসি যেন জানান দিচ্ছিল নতুন প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেমের এক নতুন জাগরণ।
