রাজধানীর আজিমপুর এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গৃহীত ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন ১১টি বহুতল ভবন ও ৮৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পিপিআর-২০১৫ এর তোয়াক্কা না করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের উৎসবে মেতেছে। সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া সাম্প্রতিক একটি অভিযোগপত্রের তথ্যানুসারে, এই প্রকল্পের প্রতিটি স্তরে জালিয়াতি, ঘুষ লেনদেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এই দুর্নীতির মূলে রয়েছে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট, যার নেতৃত্বে রয়েছেন আজিমপুর প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে সিলেটে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও ইলিয়াস আহমেদ ঢাকা থেকে তার প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন এবং ফয়সাল হালিমের সঙ্গে মিলে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন কারসাজি করছেন। এলটিএম ও ওটিএম টেন্ডারের ক্ষেত্রে পিপিআর-এর সংশোধিত ধারাগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে যোগ্য প্রতিযোগীদের কারিগরি অজুহাতে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, প্রকল্পের শুরু থেকেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে অগ্রিম ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে। নথিপত্রে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৯০ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে কয়েকশ কোটি টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এই সিন্ডিকেটের অনিয়ম কেবল টেন্ডার জালিয়াতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এই নিম্নমানের কাজ এবং মালামাল ক্রয়ের আড়ালে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও তিনি বর্তমানে কর্মস্থল পরিবর্তন করেছেন, তবুও আজিমপুর প্রকল্পে তার তৈরি করে যাওয়া সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় এবং তারা নতুন করে প্রকল্পের ব্যয় কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দুই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি করেছে। নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের মালামাল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে তারা মূলত লুটপাটের একটি নীল নকশা তৈরি করেছে, যেখানে সাধারণ ঠিকাদারদের প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই।
প্রকল্পের এই ভয়াবহ অনিয়ম কেবল আর্থিক ক্ষতিই বয়ে আনেনি, বরং পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে এনেছে। কোনো প্রকার পরিবেশগত সমীক্ষা বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট ছাড়াই আজিমপুরের পুরনো ও বিলুপ্তপ্রায় বিপুল পরিমাণ দেশি গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়েছে। এমনকি শিশুদের জন্য সংরক্ষিত খেলার মাঠ ধ্বংস করে সেখানে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের তীব্র অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগকারী যিনি, তিনি নিজেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন ঠিকাদার, তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন যে প্রকল্পের নথিপত্র এবং ব্যয়ের হিসাব সঠিকভাবে যাচাই করলে এই মহাদুর্নীতির সত্যতা সহজেই বেরিয়ে আসবে। তিনি জনস্বার্থে এবং রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা রক্ষার্থে এই প্রকল্পের সকল টেন্ডার প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে সচেতন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে আজিমপুর প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি এখানে অনেক পরে যোগদান করেছি তাই অভিযোগের বিষয়ে আমি বেশি কিছু বলতে পারব না।
এ প্রসঙ্গে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান জানান, যদি কোথাও কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকে তাহলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমান হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
