বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

উর্দু কবিতা আবৃত্তি, মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিয়াজির আত্মসমর্পণ

সমতল মাতৃভূমি ডেস্ক
ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫ ৪:৫১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ঢাকায় আর্মি মেসে মধ্যাহ্নভোজের পর আলাপরত জেনারেল নিয়াজি (বাঁ থেকে), জে এফ আর জেকব ও গ্যাভিন ইয়ং। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। ছবি: ম্যাগনাম আর্কাইভ

কয়েক দিন ধরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি ছিলেন ভগ্নহৃদয় ও গোমড়া মুখের এক ব্যক্তি। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর তাঁকে দেখাচ্ছিল আমুদে মেজাজের। ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর কোর হেডকোয়ার্টার্সের শান্তিকালীন ভবনে এসেছেন ভারতের মেজর জেনারেল গন্দর্ভ সিং নাগরা। তাঁর সামনে নিয়াজি উর্দুতে কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। পাশে অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন মুক্তিবাহিনীর টাইগার সিদ্দিকী (কাদের সিদ্দিকী)।

দুপুর ১২টার পর ওই কক্ষে প্রবেশ করেন পূর্ব পাকিস্তান গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আত্মসমর্পণের আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিনায়কের (নিয়াজি) এমন আচরণ দেখে তিনি কিছুটা অবাক হন। সে মুহূর্তের কথা তুলে ধরেছেন নিজের লেখা বই ‘হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড’-এ। ফরমান আলীর ভাষায়, একজন জেনারেল হিসেবে ‘শত্রুপক্ষের’ সামনে নিয়াজি সেদিন অত্যন্ত লজ্জাজনক আচরণ করছিলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল সমস্ত চাপ নেমে গেছে। ভারতীয়দের সঙ্গে অশ্লীল রসিকতা করছিলেন। যেন সামনে থাকা ব্যক্তিরা তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু।

শান্তিকালীন ওই ভবনে সেদিন নিয়াজি, নাগরা ও উপস্থিত অন্যদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত শর্ত নিয়ে। শর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর নামও ছিল। অর্থাৎ, পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ করতে হবে– মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে। রসিকতার পরিবেশ তখন এক মুহূর্তের জন্য বদলে যায়।

রাও ফরমান আলী আপত্তি তোলেন, পাকিস্তানিরা মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি শর্ত থেকে মুক্তিবাহিনীর নাম বাদ দিতে বলেন। ঠিক ওই সময় তামাকের পাইপ মুখে কক্ষে প্রবেশ করেন ভারতীয় বাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জেকব। রাও ফরমান আলীর উদ্দেশে বলেন, ‘এটা দিল্লি থেকে এভাবেই এসেছে। আপনি মেনে নিন অথবা ছেড়ে দিন।’ পাশে বসা নিয়াজি তখন আত্মসমর্পণের শর্তে অনুমোদনসূচক মাথা নাড়েন।

নিয়াজির তরবারি

আত্মসমর্পণ নিয়ে ওই আলোচনার মুহূর্তের কিছু বর্ণনা নিজের বই ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’য়ও লিখেছেন জে এফ আর জেকব। তাঁর বর্ণনা অনুয়ায়ী, নিয়াজি চেয়েছিলেন আত্মসমর্পণ অফিসেই হোক। রেসকোর্স ময়দানের কথা জানালে তিনি আপত্তি তোলেন। পরে তাঁকে জানানো হয়, ভারতীয় ও পাকিস্তানি বাহিনী লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকে গার্ড অব অনার দেবে। এরপর অরোরা ও নিয়াজি দলিলে স্বাক্ষর করবেন। সবশেষে নিয়াজি তাঁর তরবারি জমা দেবেন। এ কথা শুনেই নিয়াজি বলেন, ‘আমার কোনো তরবারি নেই।’ অপরপাশ থেকে তখন বলা হয়, ‘তাহলে পিস্তল জমা দিন’। কিছুটা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে নিয়াজি নীরব থাকেন। জেকব এই নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নেন।

দ্যা সারেন্ডার লাঞ্চ

কোর হেডকোয়ার্টার্সে যখন শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল, তখন বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক– বিবিসির অ্যালান হার্ট ও যুক্তরাজ্যের দ্য অবজারভারের গ্যাভিন ইয়ং। তারা এক সময় সাক্ষাৎ পান জে এফ আর জেকবের। তাঁর সঙ্গেই ভেতরে প্রবেশ করেন এই দুজন।

মধ্যাহ্নভোজ শেষে জেনারেল নিয়াজি, রাও ফরমান আলী ও গ্যাভিন ইয়ং। আলোচনা শেষে মধ্যাহ্নভোজের প্রস্তুতি নেন জেনারেল নিয়াজি। আর্মি মেসে সেদিনের খাবারের তালিকায় ছিল মুরগির রোস্ট। নিয়াজি ও জেকবের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ পান গ্যাভিন ইয়ং। পরে তিনি দ্য অবজারভারে লেখেন ‘দ্য সারেন্ডার লাঞ্চ’ শিরোনামের প্রতিবেদন। ম্যাগনাম আর্কাইভে ওই মধ্যাহ্নভোজের একটি ছবি সংরক্ষিত আছে। যেখানে দেখা যায়, নিয়াজির পাশে দাঁড়িয়ে পাইপ টানছেন জেকব। টেবিলে রুটিসহ কয়েক পদের খাবারের অবশিষ্টাংশ।

জেনারেল জেকব তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘পুরো দৃশ্যটা আমার কাছে অবাস্তব মনে হচ্ছিল। পাকিস্তানি অফিসাররা খাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করছে। যেন স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মেসে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে।’

রেসকোর্সের পথে

নিয়াজির সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের যখন আড্ডা চলছিল, তখন প্রায় ৮০০ সৈন্য নিয়ে ঢাকার দিকে এগোচ্ছিলেন ১ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী। ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, সৈন্যরা হেঁটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদী হয়ে ডেমরা পৌঁছায়। আরেকটু সামনে এগোনোর পর পথে দেখা হয় মেজর হায়দার (২ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার) ও ভারতীয় বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাবেক সিংয়ের সঙ্গে। তারা বেসামরিক পোশাকে গাড়িতে করে ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন।ওই দিনই এয়ার ভাইস মার্শাল আবদুল করিম খন্দকার কলকাতা থেকে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ঢাকায় আসেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের ছবিতেও তাদের দেখা যায়।

বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার জনবিরল পথঘাট ক্রমেই জনাকীর্ণ হতে থাকে। তাদের মুখে ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। বিকেল ৪টার দিকে ঢাকায় অবতরণ করেন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম (এ কে) খন্দকার। ছিলেন না কেবল মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানী।

মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা: ৭১’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন সমরাঙ্গন সফর করছিলেন ওসমানী। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে তাঁকে বহনকারী হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়। ওসমানী অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। অরোরা এবং এ কে খন্দকার ঢাকায় পৌঁছানোর আধাঘণ্টা পর রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে পরাজয়ের দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল নিয়াজি।

জেনারেল জেকবের বর্ণনা অনুযায়ী, স্বাক্ষর শেষে নিয়াজি কাঁধ থেকে সেনা অধিনায়কদের সম্মানসূচক ব্যাজ খুলে ফেলেন। অরোরার হাতে পয়েন্ট ৩৮ রিভলবার ন্যস্ত করেন। স্বাক্ষরিত দলিলের শিরোনামের পাশে তখন ভারতীয় সময় লেখা ৪টা ৩১ মিনিট। স্বাধীন বাংলাদেশে ঘড়ির কাঁটায় ৫টা (৪.৫৫) ছুঁইছুঁই।

সূত্র দৈনিক সমকাল

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।