সিটবিহীন টিকিটে স্বামীর বাসযাত্রা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন নওগাঁর সহকারী পুলিশ সুপার (সাপাহার সার্কেল) শ্যামলী রানী বর্মণ। তাঁর বিরুদ্ধে এক বাসচালককে নিজ কার্যালয়ে ডেকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্তে বুধবার তিন সদস্যের কমিটি করেছে জেলা পুলিশ।
গত রোববার রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের হিমাচল নামের বাসে ঘটনার সূত্রপাত। ওই বাসের সুপারভাইজার সিয়াম জানিয়েছেন, রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় তাদের বাসটি সাপাহার থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে যাত্রা করে। ওই বাসে ধানসুরা নামার কথা বলে সিটবিহীন টিকিট কাটেন এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণের স্বামী জয়ন্ত বর্মণ। তিনি নিজেকে রাজশাহীর একটি কলেজের শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজশাহীগামী এক যাত্রীর সিটে বসেন।
বাসটি দিঘার মোড়ে পৌঁছলে জয়ন্ত বর্মণকে সিট ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন সিয়াম। তখন নিজেকে সার্কেল এএসপির স্বামী পরিচয় দিয়ে হুমকি দিতে শুরু করেন জয়ন্ত। তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তিনি বাসচালক বাদলের কাছে এগিয়ে যান। তাঁর সঙ্গেও জয়ন্তের ব্যাপক কথা কাটাকাটি হয়। ধানসুরায় নেমে যাওয়ার আগে তিনি চালক ও সুপারভাইজারকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
ভুক্তভোগী বাদলের ভাষ্য, জয়ন্ত বর্মণ গাড়ি থেকে নামার পর একই পরিবহনের সাপাহার কাউন্টারের টিকিট মাস্টারকে অফিসে ডেকে নেন এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ। তিনি টিকিট মাস্টারের মোবাইল ফোন থেকে তাঁকে (বাদল) কল করে সুপারভাইজারকেও হুমকি দেন। রাত ১০টায় বাস নিয়ে তিনি সাপাহারে ফেরেন। তখন তাঁকে অফিসে ডেকে নেন এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ। পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাদলের পেটে লাথি মারেন। বেধড়ক পেটাতে থাকেন জয়ন্ত বর্মণও। এরপর শ্যামলী রানীর নির্দেশে তাঁর দেহরক্ষী আনন্দ বর্মণও পাইপ দিয়ে পেটাতে থাকেন।
মারধরের শিকার হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন চালক বাদল। তাঁকে সাপাহারের কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা না নেওয়ার শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয়। সোমবার রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন তিনি। বাসায় বিশ্রামে থাকা বাদল যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলেন, ‘এএসপি (শ্যামলী রানী বর্মণ) ম্যাডাম ও তাঁর স্বামী (জয়ন্ত বর্মণ) আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে শরীরের গোপন জায়গাগুলোতে মেরেছেন। তিনি (শ্যামলী রানী বর্মণ) বডিগার্ডকে বলেন, মাইরা হাত-পা ভেঙে দে। তারপর বডিগার্ড আমাকে এসএস পাইপ দিয়ে ইচ্ছে মতো পিটাইছে। আমি এর বিচার চাই। শ্রমিক বলে আমরা কি মানুষ না?’
বাসের যাত্রী স্কুলশিক্ষক নাসির উদ্দিন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন, শিক্ষিত মানুষ হয়েও জয়ন্ত বর্মণ যে আচরণ করেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাজশাহী কলেজের ছাত্র সজীব আহমেদও ছিলেন ওই বাসে। তাঁর ভাষ্য, ‘জয়ন্ত বর্মণ স্ত্রীর ক্ষমতা দেখিয়ে খুবই বাজে আচরণ করেছেন। বাসের মধ্যে মনে হচ্ছিল তিনি চালক আর সুপারভাইজারকে মেরেই দেবেন।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম হেলাল এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় স্থানীয় বাস মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। তারা বিষয়টি নিয়ে এএসপির (শ্যামলী) সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অশোভন আচরণের শিকার হয়েছেন। তাঁকে প্রত্যাহার ও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ মঙ্গলবার বলেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে অনকলে থাকা অবস্থায় খারাপ ব্যবহারের বিষয়টি শুনেছেন। পরে চালক ও সুপারভাইজারকে রাতেই অফিসে ডাকেন। চালক এসে ‘স্যরি’ বললেও সুপারভাইজার আসেননি। মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে সমাধান করা হয়েছে। মারধরের অভিযোগকে গুজব হিসেবে দাবি করেন তিনি। গতকাল বুধবার বক্তব্য জানতে তাঁকে কল দেওয়া হলেও ফোন কল গ্রহণ করেননি।
বুধবার দুপুর ১টার দিকে পুলিশ মিডিয়া গ্রুপ নওগাঁর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়ে বার্তা পাঠান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
এতে বলা হয়, ‘সংবাদটি আমার দৃষ্টিতে আসার পরই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জয়ব্রত পালকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ যদিও বক্তব্য জানতে তাদের কল দিলে ধরেননি।
