সোমবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

একদিনে চার পদোন্নতিতে সচিব, এরপর সম্পদ ও ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১৯, ২০২৬ ৯:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে প্রশ্ন: পদোন্নতির নথি, রাজউকের অনুমোদন ও সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি। দুদকে অভিযোগের প্রস্তুতি। ছবি: সংগৃহীত

একদিনে চার ধাপে পদোন্নতি পেয়ে সচিব হওয়া, প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ ও পদায়নে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং রাজধানীর আবাসিক এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণে বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ—সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার হরিপুর গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই সাবেক আমলার পদোন্নতির প্রক্রিয়া, সম্পদ অর্জনের উৎস এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে নজরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে ওঠে। এই বলয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তরে প্রভাব বিস্তার, বদলি-পদায়নে সুবিধা নেওয়া, নিয়োগে অনিয়ম এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ ও ফ্ল্যাট বিক্রিতে বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানীর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের তুষারধারা আবাসিক এলাকাসহ ঢাকা, কুমিল্লা ও বুড়িচংয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ফ্ল্যাট, প্লট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার দাবিও করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নথিভিত্তিক সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সরকারি নথি যাচাই ছাড়া অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

একদিনে চার পদোন্নতি: প্রশাসনিক উত্থানের নেপথ্যে কী?

অভিযোগকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রশিবির সভাপতি হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে বিসিএস ক্যাডারে যোগ দেন। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিজেকে বৈষম্যের শিকার দাবি করে তিনি একদিনে চারটি পদোন্নতি পেয়ে সচিব হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই পদোন্নতি ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। চারটি পদোন্নতির আদেশ কি একই দিনে জারি হয়েছিল, নাকি একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পদোন্নতির ধাপগুলো সম্পন্ন হয়? প্রতিটি আদেশে পদ, গ্রেড, তারিখ ও প্রযোজ্য বিধি কী ছিল? সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কমিটি ও অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কীভাবে নথিভুক্ত হয়েছে?

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, পদোন্নতির পর নজরুল ইসলাম বিভিন্ন সমিতি ও সংগঠনের ব্যানারে সরকারি দপ্তরের সভাকক্ষে সভা ও মিলনমেলার আয়োজন করতেন। এসব সংগঠনের নিবন্ধন, কার্যক্রম এবং সরকারি সভাকক্ষ ব্যবহারের অনুমোদন যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

পদোন্নতি-সংক্রান্ত মূল আদেশ ও প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করলেই এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া সম্ভব।

কথিত ‘ক্যাশিয়ার’ তোফায়েল: নিয়োগ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তোফায়েলকে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা তাঁকে সাবেক সচিবের কথিত ‘ক্যাশিয়ার’ এবং একটি প্রভাবশালী বলয়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয়কারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তাঁদের দাবি, আর্টসের শিক্ষার্থী হয়েও তোফায়েল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈধভাবে প্রোগ্রামার পদে নিয়োগ পান। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগ কমিটির সুপারিশ এবং অনুমোদনসংক্রান্ত নথি যাচাই ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তোফায়েলের ছোট ভাই হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক পরিচয় ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তিনি বুড়িচং উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে নিজ গ্রাম যদুপুরে রাতের বেলায় মদ ও গাঁজার আসর বসাতেন। সরকার পরিবর্তনের পর জামায়াত-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় গ্রহণ করেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া তোফায়েল ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার সময় বুড়িচংয়ে একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং পরে মামলা থেকে তাঁর নাম বাদ পড়ে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এসব গুরুতর দাবির ক্ষেত্রে মামলার নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই অপরিহার্য।

শিক্ষা ভবনের কর্মচারী কবির আহমেদের নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন

শিক্ষা ভবনের উন্নয়ন প্রকল্পের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে পরিচিত কবির আহমেদের পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুনের সময়ে ঘুষের বিনিময়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কর্মরত তাঁর ভগ্নিপতি ইকবালের সহায়তায় কবির আহমেদ সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব নজরুল ইসলামের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত কবির আহমেদকে নিজ উপজেলা বুড়িচংয়ে পদায়নের জন্য অন্য কর্মকর্তা মান্নানকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তাঁর আত্মীয়স্বজনদেরও সুবিধাজনক পদে পদায়ন করানোর অভিযোগ করেছেন অভিযোগকারীরা।

নিয়োগের যোগ্যতা, পদ সৃষ্টির অনুমোদন, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির আদেশ, বদলি-পদায়নের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

তুষারধারায় ২৪ কাঠা জমির বহুতল ভবন: রাজউকের নকশা ও নির্মাণবিধি মানা হয়েছে?

নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রাজধানীর তুষারধারা আবাসিক এলাকার ১০ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত একটি বহুতল ভবন বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক এই সচিবের সেখানে ২৪ কাঠা জমির ওপর নির্মিত একটি বহুতল ভবন রয়েছে। ভবনটির নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর), সেটব্যাকসহ প্রযোজ্য নির্মাণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন অবস্থায় ভবনটিতে বসবাস শুরু এবং অকুপেন্সি সনদ না থাকার দাবিও করেছেন তাঁরা।

তবে ভবনটির মালিকানা, জমির পরিমাণ, অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণের বাস্তব অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য জমির দলিল, মালিকানা ও অংশীদারত্বের তথ্য, অনুমোদিত ও সংশোধিত নকশা, নির্মাণ পরিদর্শনের প্রতিবেদন এবং অকুপেন্সি সনদের নথি পর্যালোচনা জরুরি।

অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণে অমিল পাওয়া গেলে রাজউক কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার: ২০২২ সালের রাজউক অভিযানের পর নির্মাণকাজ কীভাবে এগোল?

তুষারধারা আবাসিক এলাকার ৯ নম্বর সেক্টরে বায়তুশ শরীয়ত মসজিদের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ‘ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার’ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনটি নির্মাণের সময় রাজউক ২০২২ সালে অভিযান চালিয়ে কিছু অংশ ভেঙে দেয় এবং মুচলেকা নিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করে। পরবর্তী সময়ে নির্মাণকাজ আবার সম্পন্ন করা হয় এবং অকুপেন্সি সনদ ছাড়াই সেখানে বসবাস শুরু হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে রাজউকের অভিযানের প্রতিবেদন, মুচলেকা, নির্মাণ বন্ধ রাখার নির্দেশ, পরবর্তী নির্মাণের অনুমোদন এবং ভবনটির বর্তমান অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি কী ছিল, তা সংশ্লিষ্ট নথি থেকেই স্পষ্ট হতে পারে।

মিশন সাগরিকা অ্যাপার্টমেন্ট: পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান ও ফ্ল্যাট নির্মাণের অভিযোগ

তুষারধারা আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সেক্টরের ‘মিশন সাগরিকা অ্যাপার্টমেন্ট’ নিয়েও মালিকানা বিরোধ ও নির্মাণ অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা ভবনের উন্নয়ন প্রকল্পের কম্পিউটার অপারেটর আবু সেলিম ও মো. শাহাজাহান ২০১৭ সাল থেকে ভবনটির মালিকানা ও নির্মাণসংক্রান্ত অভিযোগ রাজউক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দিয়ে আসছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৯ ও ২০২২ সালে দুদকে মূল্যায়িত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জরিমানা ও মুচলেকা আদায় করে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান ও ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

একটি ফ্ল্যাট বিক্রির পর কাগজপত্র পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে। এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণে দুদকের অভিযোগের মূল কপি, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদন, অনুমোদিত নকশা এবং ফ্ল্যাট বিক্রির দলিল যাচাই করা প্রয়োজন।

যদুপুরের ওমর ফারুকের ধানমন্ডিতে অফিসার্স কোয়ার্টার বরাদ্দ

নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যদুপুর গ্রামের ওমর ফারুককে ধানমন্ডিতে অফিসার্স কোয়ার্টার বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, পলিটেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট পদে কর্মরত ওমর ফারুককে নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি আবাসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

সরকারি আবাসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে চাকরির ধরন, পদ, প্রাপ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রযোজ্য নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে বরাদ্দপত্র, আবেদন, যোগ্যতা যাচাইয়ের নথি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।

রফিক, তোফায়েল, মুমিন ও হাবিব: সম্পদ অর্জনের উৎস অনুসন্ধানের দাবি

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, যদুপুর গ্রামের রফিক, তোফায়েল, মুমিন ও হাবিব সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে থাকা কথিত বলয়ের সুবিধাভোগী। তাঁদের দাবি, প্রায় চার দশক আগে নোয়াখালী থেকে আসা এই পরিবারটি পরবর্তী সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে।

তবে সম্পদের পরিমাণ, প্রকৃত মালিকানা এবং অর্জনের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ভূমি নিবন্ধন, আয়কর নথি, কোম্পানির মালিকানা ও আর্থিক লেনদেন যাচাই প্রয়োজন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মুমিন ঘুষের বিনিময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকের পদ পান এবং অল্প সময়ে আদাবর, উত্তরা, বসুন্ধরা, কুমিল্লা, দৌলতপুর ও বুড়িচংয়ে প্লটসহ স্কুল ও হাসপাতালের মালিক হন। তাঁর আত্মীয় দ্বীন মোহাম্মদের ছেলে সোহেল রানাকে বঙ্গবন্ধু ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার নামে ১১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সিস্টেম অ্যানালিস্ট শাহিনের মাধ্যমে জালিয়াতি করে নিয়োগসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করা হয়েছিল। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে নিয়োগের নথি, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কাজী মামন: ফ্ল্যাটের মালিকানা ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

অভিযোগে কাজী মামনের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, খিলক্ষেতের স্টক এক্সচেঞ্জে চাকরিরত মামন সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে থাকা বলয়ের সহায়তায় একাধিক ভবনের ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন।

তাঁদের আরও অভিযোগ, মামন নিজেকে নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করে ছবি দেখিয়ে অবৈধ দখল, বদলি-বাণিজ্য ও ঠিকাদারি কাজের তদবির করতেন।

তবে এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটের দলিল, সম্পদ অর্জনের উৎস, চাকরির আয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং কথিত তদবিরের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন: প্রকৃত মালিকানা ও কার্যক্রম যাচাইয়ের দাবি

অভিযোগকারীরা নজরুল ইসলামকে ঘিরে থাকা কথিত বলয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নাম উল্লেখ করেছেন। তালিকায় রয়েছে—কনটেক ডেভেলপার, ওয়নল্যান্ড ডেভেলপার, কনফিডেন্স গ্রুপ, রোজ গার্ডেন অ্যাসোসিয়েশন, মিশন ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট, বুড়িচং পলিটেকনিক, বুড়িচং আধুনিক হাসপাতাল, বুড়িচং ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, রওশন-সিরাজ ফাউন্ডেশন, মিশন শ্যামলিমা, মিশন লাইট হাউজ, মিশন গার্ডেন ঢাকা এবং কনফিডেন্স সফটওয়্যার।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি ভবন নির্মাণ, ডেভেলপার কার্যক্রম, সম্পদ অর্জন ও প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বুড়িচং ওয়েলফেয়ার সোসাইটি তুষারধারা আবাসিক এলাকার একটি ঠিকানা ব্যবহার করে দীর্ঘদিন আড়ালে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কথিত ভুয়া ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নামে ভবন নির্মাণ, কাগজপত্রে অসংগতি এবং ফ্ল্যাট বিক্রির অভিযোগও সামনে এসেছে।

তবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া, অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করার আগে নিবন্ধন, পরিচালনা পর্ষদ, প্রকৃত মালিকানা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, কর-সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ভবনের অনুমোদন যাচাই করা জরুরি।

সম্পদের উৎস, আয়কর নথি ও ফ্ল্যাট বিক্রির দলিল খতিয়ে দেখার দাবি

অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঢাকা, কুমিল্লা ও বুড়িচংয়ে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, ফ্ল্যাট বিক্রির সময় কাগজপত্র পরিবর্তন এবং ক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগগুলো সত্য হলে তা কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের বিষয় নয়; সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিধি প্রয়োগ, আবাসন খাতে ক্রেতাদের অধিকার এবং সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি পালনের প্রশ্নও জড়িত হতে পারে।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য, কোম্পানির শেয়ার ও পরিচালনা পর্ষদে অবস্থান, জমির দলিল এবং ফ্ল্যাট বিক্রির নথি সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে রাজউকের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা ভবনগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তদন্তের আওতায় পদোন্নতি-সংক্রান্ত আদেশ ও প্রশাসনিক নথি, তুষারধারার ১০ নম্বর সেক্টরের বহুতল ভবন, ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ার এবং মিশন সাগরিকা অ্যাপার্টমেন্টের অনুমোদিত নকশা, বাস্তব নির্মাণ, অকুপেন্সি সনদ ও রাজউকের পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনার কথা বলেছেন অভিযোগকারীরা।

এ ছাড়া ২০২২ সালের রাজউক অভিযানের পর ফ্রেন্ডস ভিউ টাওয়ারে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হয়ে থাকলে তার অনুমোদন ও আইনগত ভিত্তি যাচাই, মিশন সাগরিকা অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে ২০১৭, ২০১৯ ও ২০২২ সালের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা, কবির আহমেদের নিয়োগ ও পদায়নের বৈধতা পরীক্ষা এবং ওমর ফারুকের আবাসন বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা অনুসরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি রয়েছে।

তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, প্রকৃত মালিকানা, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর নির্মাণ অনুমোদন যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক, দেওয়ানি বা ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

জবাবদিহি নিশ্চিত হোক, নথিতে বেরিয়ে আসুক প্রকৃত চিত্র

একজন সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি, সম্পদ অর্জন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ভবনের মালিক হওয়া নিজে থেকেই অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে সরকারি পদে থেকে প্রভাব খাটানো, বিধিবহির্ভূত নির্মাণে সহায়তা, অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা নিয়োগ ও বদলি-পদায়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও সরকারি নথি, রাজউকের অনুমোদন, সম্পদ বিবরণী, নিয়োগ ও পদোন্নতির আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অভিযোগকারীদের প্রধান দাবি—সাবেক সচিব নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, তুষারধারাসহ সংশ্লিষ্ট আবাসিক এলাকার ভবনগুলোর নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ যাচাই করা হোক এবং তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ অর্জনের উৎস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, রাজউক ও তদন্তকারী সংস্থাগুলো এসব অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র কতটা প্রকাশ পায়।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।