★ কোটি টাকার মাছ চাষের দাবি, কিন্তু নেই উৎপাদন–ব্যয়ের প্রমাণ
★ চার করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অনুপস্থিত—তদন্তে বড় গড়মিল
★ আদালতে চার্জশিট গ্রহণের পর মন্ত্রণালয়ের কঠোর পদক্ষেপ
কাগজে-কলমে মাছ চাষের আয়ে কোটি টাকার হিসাব, কিন্তু মাঠপর্যায়ের তদন্তে তার প্রমাণ মিলেনি—এমন অভিযোগে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) মোঃ আমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, দুর্নীতি মামলায় আদালত চার্জশিট গ্রহণ করায় সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৯(২) অনুযায়ী তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
মামলার পটভূমি: ‘মাছের আয়’ দিয়ে সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ দায়ের করা মামলার অনুসন্ধান শেষে ২০ মার্চ ২০২৫ চার্জশিট দাখিল করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগে বলা হয়, সাবেক গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-৭ (ঢাকা) ও বর্তমান টাঙ্গাইল কর্মরত আমিনুল ইসলাম ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে ১,০৪,১৪,৭৬০ টাকা আয় দেখান।
নথিতে উল্লেখ রয়েছে—
.৫ বছরের চুক্তিতে প্রায় ১৯০ একর পুকুর শ্রেণীর জমি লিজ নেওয়ার দাবি
.পরবর্তীতে ১.৭০ ও ১.৯০ একর পুকুরের পৃথক লিজ
.ছয় বছরে ধারাবাহিকভাবে বছরে প্রায় ১৯–২০ লাখ টাকা আয় প্রদর্শন।
কিন্তু তদন্তে এই আয়কে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।
তদন্তে ধরা পড়ে গড়মিল: নেই আয়কর, নেই উৎপাদনের হিসাব
দুদকের অনুসন্ধানে যে অসঙ্গতিগুলো উঠে এসেছে—
২০১৬-১৭ থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্ন পাওয়া যায়নি
সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল লিখিতভাবে রিটার্ন অনুপস্থিতির বিষয় নিশ্চিত করে
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরিদর্শনে নিবিড় মাছ চাষের প্রমাণ বা উৎপাদন–বিক্রির হিসাব পাওয়া যায়নি
পোনা, খাদ্য, শ্রমিক বা অন্যান্য ব্যয়ের কোনো রেকর্ড উপস্থাপন করা হয়নি
এছাড়া ১.৯০ একর হিসেবে দেখানো পুকুরের বাস্তব আয়তন খতিয়ানে প্রায় ৭৬ শতাংশ পাওয়া যায়—যা আয় হিসাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সম্পদের হিসাব: ৮০ লাখ টাকার অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়—
* স্থাবর–অস্থাবর সম্পদ: ১,২৭,৩৫,৭২১ টাকা
* পারিবারিক ব্যয়: ১২,০০,৫৯৪ টাকা
* নিট সম্পদ: ১,৫৯,০৬,০১৫ টাকা
* গ্রহণযোগ্য আয়: ৫৮,৫৫,২৯২ টাকা
এই হিসাবে ৮০,৮১,০২৩ টাকা জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মত দেয় দুদক। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৭(১) ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
জব্দ নথি ও সাক্ষ্য: কর রেকর্ড উদ্ধার, অনুপস্থিতির প্রমাণ
২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পুরাতন ভবন (সেগুনবাগিচা) থেকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন জব্দ করা হয়। সংশ্লিষ্ট অফিস সহকারী ও কর্মচারীদের জবানবন্দীতেও আগের করবর্ষগুলোর রিটার্ন অনুপস্থিতির বিষয় পুনরায় উঠে আসে।
চার্জশিট গ্রহণের পর প্রশাসনিক পদক্ষেপ
চার্জশিট ৭ জুলাই ২০২৫ আদালতে গৃহীত হওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মন্ত্রণালয় সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারি করে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হলো।
যে প্রশ্নগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে
* কাগজে দেখানো কোটি টাকার মাছ চাষের বাস্তবতা কোথায়?
* চার করবর্ষের আয়কর রিটার্ন অনুপস্থিত থাকার কারণ কী?
* জমির পরিমাণে গড়মিল থাকলে আয় নির্ধারণ কীভাবে হলো?
* সরকারি প্রকৌশলী পদে থেকে সম্পদ বৃদ্ধির উৎস কী?
উল্লেখ্য যে, মাছের খামার’ ঘিরে কোটি টাকার এই আর্থিক হিসাব এখন গণপূর্ত অঙ্গনে আলোচিত এক রহস্য। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান—অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ড, আর প্রমাণিত না হলে অব্যাহতি। তবে তদন্তে উঠে আসা অসঙ্গতিগুলো ইতোমধ্যেই সরকারি সম্পদ বিবরণী ও জবাবদিহি ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
