শিশুদের বিকাশে কারাগারের পরিবেশ অনুকূল নয়, বিকল্প পারিবারিক যত্ন ও নিরাপদ আবাসনের সুপারিশ।ছবি-সংগৃহীত
দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে রয়েছে ৩০৩টি শিশু। এসব শিশুর মধ্যে ১৫৩ জন কন্যাশিশু এবং ১৪৬ জন ছেলেশিশু বলে হাইকোর্টে দাখিল করা সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মায়েদের কেউ সাজা ভোগ করছেন, আবার কারও বিরুদ্ধে থাকা মামলা বিচারাধীন।
কারাগারে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় বিকল্প পারিবারিক যত্নে পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। নিরাপদে নিকটাত্মীয়ের কাছে রাখা সম্ভব না হলে সরকারি শিশু পরিবার বা উপযুক্ত নিরাপদ আবাসনে রেখে তাদের লালন-পালন ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা ইউনিট ও প্রবেশন শাখার সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পাঠানো প্রতিবেদনে কারাগারে থাকা শিশুদের সুরক্ষার আইনি ভিত্তি, বিদ্যমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।
কারাগারের পরিবেশ শিশুর বিকাশের অনুকূল নয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মায়েদের সঙ্গে কারাগারে থাকা শিশুদের শিশু আইন অনুযায়ী সুবিধাবঞ্চিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারাগারের পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল নয়। তাই শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নির্দিষ্ট বয়স বা সময়সীমা শেষে নিকটাত্মীয়ের কাছে বিকল্প পারিবারিক যত্নে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিকটাত্মীয়ের কাছে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি শিশু পরিবার কিংবা উপযুক্ত নিরাপদ আবাসনে রেখে তাদের যত্ন, লালন-পালন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে অধিদপ্তর।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শিশু আইন, ২০১৩-এর মূল দর্শন হলো শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করা। আইনের ৮৯(১)(৬) ধারা অনুযায়ী, কারাভোগরত মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল অথবা কারাভোগরত মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকা শিশু সুবিধাবঞ্চিত শিশু হিসেবে গণ্য। ফলে এসব শিশুর জন্য বিশেষ সুরক্ষা, যত্ন-পরিচর্যা ও উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আইনগত ভিত্তি রয়েছে।
কোনো শিশুর ক্ষেত্রে অবহেলা কিংবা অরক্ষিত পরিস্থিতি দেখা দিলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প পরিচর্যার ব্যবস্থা নেওয়াও সমাজসেবা অধিদপ্তরের দায়িত্ব বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুদের সংখ্যা ও বয়স জানতে হাইকোর্টের নির্দেশ
এর আগে গত ১৫ জুন দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের সংখ্যা ও বয়সের বিবরণ জানতে চেয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন চেয়েছিলেন হাইকোর্ট। একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে রুলে জানতে চাওয়া হয়, কারাগারে থাকা এসব শিশুর নিরাপত্তা, কল্যাণ, শিক্ষা, সঠিক বিকাশ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রতিবেদন দাখিল করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশের পর রিটটির চূড়ান্ত শুনানি হতে পারে বলে জানিয়েছেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার কামরুন নাহার দিপা।
৭৪ কারাগারে ২৯৯ শিশু, সবচেয়ে বেশি কাশিমপুরে
কারা অধিদপ্তরের ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ছিল ২৯৯টি শিশু। এসব শিশুর মায়েদের বেশির ভাগই মাদক মামলার আসামি বলে কারা অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা গেছে।
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগের ১৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ছিল ১০০ শিশু। চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারে ৯০, রাজশাহী বিভাগের আটটি কারাগারে ২৫ এবং সিলেট বিভাগের পাঁচটি কারাগারে ছিল ১৯ শিশু।
এ ছাড়া রংপুর বিভাগের আটটি কারাগারে ২৫, খুলনা বিভাগের ১০টি কারাগারে ২০, বরিশাল বিভাগের ছয়টি কারাগারে চার এবং ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে ছিল ১৩ শিশু।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মায়েদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি শিশু রয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে।
হাইকোর্টে দাখিল করা সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে ৩০৩ শিশুর কথা বলা হলেও কারা অধিদপ্তরের ২৬ এপ্রিলের তথ্যে ছিল ২৯৯ শিশুর হিসাব। দুটি তথ্যের সময়কাল ও গণনার ভিত্তি এক কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বর্তমান সংখ্যা ও শিশুদের বয়সভিত্তিক বিস্তারিত চিত্র নিশ্চিত করতে হালনাগাদ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
