স্ত্রী ও মাত্র ৯ মাসের শিশুসন্তান—জীবনের সবচেয়ে আপন দুটি মুখকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ মিলল কারাগারের লোহার ফটকের সামনে, তাও মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। প্যারোলে মুক্তি না পেয়ে দূর থেকেই স্ত্রী ও সন্তানের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে থাকলেন বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম।
শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তাদের ৯ মাসের শিশু নাজিমের মরদেহ আনা হয় কারাফটকে। কারা কর্তৃপক্ষ মানবিক বিবেচনায় সাদ্দামের পরিবারের ছয় সদস্যকে কারাফটকে প্রবেশের অনুমতি দেয়। সেখানেই মিনিট পাঁচেক সময় ধরে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখার সুযোগ পান বন্দি সাদ্দাম।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়াই অনেক সময় স্বজনের মরদেহ কারাফটকে আনা হলে বন্দিকে শেষ দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়। সেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘরের মেঝেতে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায় তাদের ৯ মাসের শিশু নাজিমকে। পুলিশ ও পরিবারের দাবি, চরম হতাশায় শিশুসন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন স্বর্ণালী।
স্বজনদের আবেদনের পরও এই মর্মান্তিক ঘটনায় সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও কান্না ছড়িয়ে পড়ে।
সাদ্দামের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী বলেন, স্ত্রী-সন্তান মারা যাওয়ার পর আমরা কারাগারে যোগাযোগ করি। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। সে কোনো হত্যা মামলার আসামি নয়, রাজনৈতিক মামলায় বন্দি। মানবিক দিক বিবেচনায় অন্তত জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।”
কারাফটকের সামনে আহাজারিতে ভেঙে পড়েন সাদ্দামের শ্যালিকা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সে তো খুনি না। রাজনৈতিক মামলায় বন্দি ছিল। তাও তাকে ছাড়া হলো না। সাদ্দাম শুধু দুলাভাই না, আমাদের বড় ভাইয়ের মতো ছিল। স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় একবার অংশ নিতে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো?”
উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন জুয়েল হাসান সাদ্দাম। বর্তমানে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
কারাগারের লোহার ফটকের ভেতর দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিট—এই অল্প সময়েই স্ত্রী ও সন্তানের নিথর মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ বিদায় জানানোর সেই দৃশ্য যেন নীরবে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আইনের কঠোরতার ভিড়েও কি মানবিকতার জন্য একটু সময় পাওয়া যেত না?
