সোমবার, ২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্ষমতার ছায়ায় ‘অদৃশ্য সাম্রাজ্য’: অভিযোগের পাহাড়েও অটল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ১, ২০২৬ ৭:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাম্প্রতিক সময় শত অনিয়ম, ভুরিভুরি অভিযোগ, একের পর এক তদন্ত—তবুও যেন অদৃশ্য এক বলয়ে সুরক্ষিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম–৪ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলম। সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, ঘুষ, প্রভাব খাটানো, এমনকি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্কের এক ঘন কুয়াশা। কিন্তু প্রশ্ন একটাই- এত কিছুর পরও তিনি কীভাবে বহাল তবিয়তে নিজের চেয়ারে?

পরিচয়ের আড়ালে প্রভাবের রাজনীতি : খুলনা সদরের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিয়াপাড়া নতুন রাস্তার তালুকদার আব্দুল খালেক ও আকতারুন নেছার সন্তান নিয়াজ তানভীর আলম। ২০০৯ সালে ছাত্রলীগ কোটায় ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে নিজেকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান। খুলনার সাবেক সংসদ সদস্য ও সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক–এর নামের সঙ্গে তার পিতার নাম মিলে যাওয়াকে ঘিরে তিনি নাকি প্রচার করতেন—তিনি সেই প্রভাবশালী নেতার পুত্র । উদ্দেশ্য একটাই—দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা আদায়। অভিযোগ, এই ‘পরিচয় কৌশলে’ ব্যবহার করে বদলি বাণিজ্য থেকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ—সবখানেই বিস্তার ঘটান নিজের প্রভাবের।

কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে আজিমপুর—তদন্তে নাম, শাস্তি নেই : ৪০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে ২০১৭ সালে গণপূর্তের তদন্ত কমিটি ৩৭ জন প্রকৌশলীকে দোষী সাব্যস্ত করে। সেই তালিকায় ছিলেন নিয়াজ তানভীর আলমও। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে—তদন্তের কালি শুকানোর আগেই সবকিছু চাপা পড়ে যায়।

২০১৯ সালে মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে ৬৮টি লিফট স্থাপনের ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুপারিশের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ই/এম–৩ শাখায় থাকাকালে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে কার পার্কিং শেড নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলামকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন হয়—প্রতিবেদনে তাকে অভিযুক্ত করা হলেও দৃশ্যত কোনো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সচিবালয়েও বিতর্ক, আগুনের ছায়া : সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনকালে নিম্নমানের ইলেকট্রনিক পণ্য সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনে নিম্নমানের সরঞ্জামের বিষয়টি উঠে আসে—সেখানেও তার নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় আসে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বঙ্গভবন অধ্যায় : প্রভাবের শিখরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে বঙ্গভবন–এ কর্মরত থাকাকালে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ঠিকাদার লিখিত অভিযোগ দিলেও সেগুলোর অধিকাংশই ‘আলোর মুখ দেখেনি’—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগের বাইরে প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক- গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার–এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি—এমন অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একাধিক মন্ত্রী–এমপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা ছিল বলেও দাবি বিভিন্ন সূত্রের।
সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে বদলির পরও প্রায় এক মাস দুই জায়গায় দায়িত্ব পালন করার নজিরও রয়েছে বলে অভিযোগ।

সম্পদের পাহাড়: বেতনের সঙ্গে অসামঞ্জস্য? সরকারি নিয়মে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় ৬০ হাজার টাকার মতো বেতন পান। অথচ নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি—তার মাসিক ব্যয় কয়েক লক্ষ টাকা। রাজধানীর সেগুনবাগিচার কনকর্ড টাওয়ারে কয়েক কোটি টাকায় ফ্ল্যাট ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে; যদিও কেয়ারটেকার বলছেন তিনি ভাড়াটিয়া—মাসিক ভাড়া প্রায় ৭০ হাজার টাকা। প্রশ্ন উঠছে—একজন সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এমন ব্যয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
স্ত্রী শাকিলা ইসলামের নামে দামি গাড়ি, খুলনায় একাধিক বাড়ি–জমি, ঢাকায় ফ্ল্যাট–প্লট—এমন নানা সম্পদের তথ্য ঘুরছে বিভিন্ন মহলে। অভিযোগ রয়েছে—পিতা, মাতা, স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের নামে বেনামে সম্পদ ক্রয় করে আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

দুদকে অভিযোগ, কিন্তু নীরবতা কেন? দুর্নীতি দমন কমিশন–এ তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান—অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্ত্রী–সন্তানসহ আত্মীয়স্বজনের সম্পদের হিসাবও খতিয়ে দেখা হবে।
এ বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালিকুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর আলমের ফোনেও একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

অভিযোগের পাহাড়, তদন্তের পর তদন্ত, সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন—সবকিছুর পরও কেন অটুট তার অবস্থান? কোন অদৃশ্য ছায়া তাকে আগলে রেখেছে? প্রশাসনের ভেতরে কি এখনও সক্রিয় কোনো পুরনো সিন্ডিকেট? প্রশ্নগুলো এখন ঘুরছে গণপূর্তের করিডরে, ঠিকাদার মহলে, এমনকি প্রশাসনের ভেতরেও। উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ—দুর্নীতির এই গোলকধাঁধায় শেষ পর্যন্ত আইন কি সত্যিই নিজের পথ খুঁজে পাবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ