বদরুলের ‘অপকর্মে’ ডুবছে গণপূর্ত অধিদপ্তর- রাষ্ট্রের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গণপূর্ত অধিদপ্তর—যে দপ্তরের হাত ধরে গড়ে ওঠে সেতু, দালান, থানা-ভবন, সরকারি কার্যালয়—সেই প্রতিষ্ঠানই এখন অভিযোগের ঘূর্ণাবর্তে। আর এই ঝড়ের কেন্দ্রে নামটি ঘুরপাক খাচ্ছে এক ব্যক্তিকে ঘিরে: সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান।
আশার আলো থেকে অন্ধকারে : চলতি দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী—অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত, পেশাগত দক্ষতায় আলোচিত এক কর্মকর্তা। পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙ্গিয়ে তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্তি নিয়ে শুরুতে বিতর্ক থাকলেও, তাঁর ইতিবাচক মনোভাব ও সংস্কারমুখী বার্তায় দপ্তরের ভেতরে জন্ম নেয় নতুন প্রত্যাশা।
কিন্তু সেই আশায় যেন ধুলো উড়িয়ে দেয় একের পর এক বিতর্ক। অভিযোগ উঠছে—খালেকুজ্জামানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বদরুল আলম খানের প্রভাব ও কর্মকাণ্ডে দপ্তরের নৈতিক ভিত নড়ে গেছে। নিয়োগ-বদলি থেকে টেন্ডার—সবখানেই নাকি তাঁর একক প্রভাব। ফলে চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী নিজেই যেন হয়ে পড়েছেন প্রভাববলয়ের ভেতর বন্দী।
ক্ষমতার পালাবদল, চরিত্রেরও?
গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে বদরুল ছিলেন তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক সখ্যতাকে পুঁজি করে নিয়োগ-বদলি ও প্রকল্প বণ্টনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তখনই শোনা যেত।
পরিস্থিতি বদলাতেই বদলে যায় তাঁর অবস্থানও—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। নিজেকে নতুন রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি। বর্তমান সচিব মো. নজরুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর ‘বৃহত্তর কুমিল্লা’ পরিচয়ের সূত্র ধরে সচিবালয়ে তাঁর প্রবেশাধিকার আরও দৃঢ় হয়—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট জনের।
সিন্ডিকেটের ছায়া- অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ঘিরে। বলা হচ্ছে, ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকার কিছু ঠিকাদারকে নিয়ে শক্তিশালী একটি গ্রুপ গড়ে তুলেছেন বদরুল। এই গ্রুপকে কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ওপর ফোনে ও সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
কুমিল্লার একটি ইএম টেন্ডারে ভুয়া সনদধারী ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও শোনা গেছে। মিরপুর অঞ্চলে ‘আসিফ’ নামের এক ঠিকাদারকে কাজ দিতে বিভিন্ন দপ্তরে ফোন করে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও ঘুরছে প্রকৌশলীদের আলোচনায়। পুলিশের ১০৭ থানা নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ভাষানটেক থানার টেন্ডার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এমনকি আরবরিকালচার বিভাগের দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও অন্য ডিভিশনের মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়া পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে—যা বিধিবহির্ভূত বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পর্দার আড়ালের ব্যবসা?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য—সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ডেভেলপার ব্যবসায় জড়িত বদরুল আলম। তাঁর আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে এ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ পায়নি, তবে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তুঙ্গে।
বদরুলের বক্তব্য- অভিযোগ অস্বীকার করে বদরুল আলম খান বলেন, “প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকে আমাকে দূরে সরাতে একটি মহল সক্রিয়। আমি ভালো কাজ করছি বলেই অপপ্রচার চলছে। সিন্ডিকেট, চাপ প্রয়োগ বা ঠিকাদারি ব্যবসার অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য—“এসব ভিত্তিহীন।
দপ্তরের ভেতরে জ্বলছে ক্ষোভের আর্তনাদ- গণপূর্তের বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা জানা গেছে। তাঁদের ভাষ্য—প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও নীতিনিষ্ঠা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা।
উল্লেখ্য রাষ্ট্রের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি এই দপ্তর। সেখানে যদি ব্যক্তিস্বার্থ, সিন্ডিকেট ও প্রভাবের ছায়া ঘন হয়—তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনস্বার্থই।
এখন প্রশ্ন একটাই—গণপূর্ত অধিদপ্তর কি আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে, নাকি অভিযোগের ভারেই আরও গভীরে তলিয়ে যাবে?
বদরুলের অপকর্মের বিস্তারিত থাকছে পরের সংখ্যায়।
