খসড়া জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশকে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে নেওয়া একটি ‘বিদায়ী পরিহাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম সংস্কারের দাবি উপেক্ষা করে শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে এমন দুটি খসড়া প্রকাশকে জনপ্রত্যাশার পরিপন্থী বলেই মনে করছে সংস্থাটি।
শনিবার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ প্রায় ১০ মাস ধরে বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে সরকার এখন এমন খসড়া সামনে এনেছে, যা মূলত স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার বদলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করার ইঙ্গিত দেয়।
সংস্কারের নামে নিয়ন্ত্রণের কাঠামো? টিআইবির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, প্রস্তাবিত উভয় কমিশনের গঠন কাঠামো, কমিশনারদের পদমর্যাদা, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই আমলাতন্ত্রনির্ভর এবং সরাসরি সরকারি কর্তৃত্বাধীন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কমিশনগুলো কার্যত স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করার সুযোগ হারাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই প্রস্তাবনা মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সম্প্রচার বিকাশের প্রত্যাশার প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের পরিহাসমূলক আচরণের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।
তার মতে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদজুড়েই গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় চাপ, সহিংসতা এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নানা অপচেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সরকার এসব নিয়ন্ত্রণমূলক প্রবণতা রোধে ব্যর্থ হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে বলেও অভিযোগ করে টিআইবি।
মাত্র তিন দিনের মতামত: অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার ব্যত্যয়— খসড়া দুটি নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র তিন দিনের সময় নির্ধারণ করাকেও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল খাতে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন স্বল্প সময়ের মধ্যে মতামত আহ্বান কোনোভাবেই অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এটিকে শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ‘গোপনীয়তার চর্চা’ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের নামে একাংশের সংস্কারবিরোধী অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার ধারাবাহিক উদাহরণ হিসেবেও দেখছে টিআইবি।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া অনেক রাজনৈতিক দল অতীতে মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সম্প্রচার মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তারা নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারণায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করছে।
এই প্রেক্ষাপটে টিআইবির আহ্বান—নতুন সংসদ গঠনের পর যেন এসব রাজনৈতিক দল তাদের অভিজ্ঞতা, অঙ্গীকার ও জনপ্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি প্রকৃত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও অভিন্ন গণমাধ্যম কমিশন গঠন, যা পেশাগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করে দেশে মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সম্প্রচারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত মত, গণমাধ্যম কমিশন হতে পারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ—যদি তা সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়। কিন্তু সংস্কারের বদলে যদি নিয়ন্ত্রণই মুখ্য হয়ে ওঠে, তবে তা গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার—সবকিছুর জন্যই উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।
