খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ সরকারি একটি দপ্তর নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণাধীন জায়গা হয়ে উঠেছে—এমন অভিযোগ উঠছে স্থানীয়দের মধ্যে। বদলির আদেশ আসলেও তা কার্যকর হয় না; এই প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করে রাজনৈতিক তদবীর, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প এবং ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অদৃশ্য ছায়া।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম, যিনি ২০১৪ সালে খুলনা গণপূর্তে যোগ দেওয়ার পর থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একই পদে বহাল রয়েছেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রকৌশলীদের প্রতি তিন বছর পর বদলি হওয়া বাধ্যতামূলক, তবুও সাইফুল ইসলামের বদলি হয়নি। তার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয় ও শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠতার নামও উঠে আসে। বিশেষত শেখ সোহেল ও খুলনা মহানগর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজনকে তার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, সাইফুল ইসলাম নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পর্যন্ত সবাইকে নিয়মিত চাপ ও ভয়ভীতিতে রাখতেন। ফলে টেন্ডার, বিল অনুমোদন, কাজের মান—সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণাধীন চলত।
সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে অবকাঠামো ভঙ্গুর, ওয়াশরুম অচল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রায়। অভিযোগ, নকশা ও বিলের সঙ্গে বাস্তব কাজের কোনো মিল নেই, আর কোটি কোটি টাকার বরাদ্দের কাগজে-কলমে সংস্কারের ছদ্মচিত্র দেখানো হয়।
বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত ‘কোভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া ও মহামারি প্রস্তুতি প্রকল্প’-এও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০ শয্যার ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও ৫ শয্যার প্যাডিয়াট্রিক আইসিইউ স্থাপন প্রকল্পে সরেজমিন পরিদর্শনে প্রায় ৪৪ লাখ টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাতের তথ্য উঠে এসেছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এন বিল্ডার্স জানায়, নকশাবহির্ভূত এস্টিমেট নিয়ে প্রশ্ন তুললে সাইফুল ইসলাম হুমকি দিয়ে চুপ করাতে চেষ্টা করেছেন। চরম অবস্থায় ঠিকাদার বাধ্য হয়ে কেবল দেখানো কাজই করেছেন।
বদলির আদেশ এলেও তদবীর থামেনি। ২০২০ সালে বাগেরহাটে বদলি হলেও মাত্র দুই মাসের মধ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে খুলনায় ফিরে আসেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুলাই-নভেম্বরের চার মাসে তিন দফা বদলির খরচ ৩০ লাখ টাকার বেশি হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকার পরিবর্তনের পরও সিন্ডিকেটের প্রভাব থেমে যায়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, বিএনপি নেতা লাভু বিশ্বাসের আশ্রয়ে একই কৌশলে খুলনা গণপূর্তে প্রভাব বজায় রেখেছেন সাইফুল ইসলাম।
খুলনাবাসী প্রশ্ন তুলছেন—এক যুগের বেশি সময় ধরে কেন বিতর্কিত একজন প্রকৌশলী একই দপ্তরে বহাল রয়েছেন? কোটি কোটি টাকার প্রকল্প কি শুধু সিন্ডিকেটের হাতে নিয়ন্ত্রণাধীন? স্থানীয়রা গণপূর্ত উপদেষ্টা, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করছেন। নইলে খুলনা গণপূর্ত “উন্নয়নের নয়, দুর্নীতির প্রতীক” হিসেবেই ইতিহাসে নাম লিখবে।
এসব বিষয় জানতে সাইফুল ইসলাম এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোনকল গ্রহণ করেননি।
