ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনা-৩ আসনে নির্বাচনী প্রচারণা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুলের নেতৃত্বে প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রা ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দলমত নির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক সাধারণ ভোটার, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে।
দুপুরের পর খুলনা মহানগরের বৈকালী এলাকা থেকে শুরু হওয়া পদযাত্রাটি ফুলবাড়ী এলাকায় পথসভার মাধ্যমে শেষ হয়। দৌলতপুর, খালিশপুর ও দিঘলিয়ার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত খুলনা-৩ আসনে এ সময় শিল্পাঞ্চল পুনরুজ্জীবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি ছিল প্রচারণার মূল স্লোগান। পদযাত্রায় খুলনা মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দও অংশ নেন।
ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়সহ- পথে পথে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন রকিবুল ইসলাম বকুল। তিনি বলেন, আপনার ভোট আপনি দেবেন, তবে বুঝেশুনে দেবেন। যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিলে এলাকাটির উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। একজন নাগরিক হিসেবে আপনার ভোট অত্যন্ত মূল্যবান।
বিশেষ করে নারী ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন তিনি এবং উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।
ভোটার পরিসংখ্যান- নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী খুলনা-৩ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৯ জন। এর মধ্যে—
পুরুষ ভোটার: ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৩৬ জন
নারী ভোটার: ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৬৫ জন
তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার: ৮ জন
শিল্প পুনরুজ্জীবনই প্রধান ইস্যু
প্রচারণায় ধানের শীষ প্রার্থীর প্রধান অঙ্গীকার ছিল বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত খালিশপুর শিল্পাঞ্চল খুলনা-৩ আসনের নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত—
খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল: ১৯৫৭ সালে ভৈরব নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত। লোকসানের কারণে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর বন্ধ। জমির পরিমাণ ৮৭ দশমিক ৬১ একর।
খুলনা হার্ডবোর্ড মিল: ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত, বন্ধ হয় ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর।
দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি: ১৯৫৫ সালে রূপসা এলাকায় স্থাপিত, এক যুগের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ।
এই তিন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চল বন্ধ হওয়ার পর পুরো এলাকার অর্থনীতি স্থবির হয়ে গেছে।
বাস্তবায়ন হয়নি একের পর এক প্রকল্প-
কারখানাগুলোর জমিতে শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করলেও সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলো হলো—
২০০৫: বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর উদ্যোগ—দরপত্রে সাড়া মেলেনি।
২০০৯: ৪২২ কোটি টাকায় নতুন কাগজকল স্থাপনের প্রস্তাব।
২০১৪: তিনটি কাগজকল নির্মাণ পরিকল্পনা
২০১৮: ৫০ একর জমি বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে বিক্রি
২০১৯: টিএসপি সার কারখানা পরিকল্পনা—পরে বাতিল
২০২১: কার্বন, এসিড ও কাগজকল প্রকল্প
২০২২: নতুন সমীক্ষা—ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল বা বিকল্প।
শিল্প স্থাপনের সুপারিশ– শ্রমিকদের হতাশা
কারখানা বন্ধ হওয়ার পর বহু শ্রমিক পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন, অনেকে এখনও বেকার। স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, শিল্পাঞ্চল পুনরায় চালু না হলে এ এলাকার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। এ হতাশা দূর করতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে নিরলস ভাবে কাজ করতে বদ্ধপরিকর।
ভোটের সমীকরণে শিল্প ইস্যু– এ অবস্থায় খুলনা-৩ আসনে শিল্প পুনরুজ্জীবন ও কর্মসংস্থান নির্বাচনের অন্যতম নির্ধারক ইস্যু হয়ে উঠেছে। ধানের শীষ প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল আশ্বাস দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে পরিত্যক্ত শিল্প জমিতে নতুন শিল্প স্থাপন করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্রশ্নই এই আসনের ভোটের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের মাধ্যমে সেই প্রতিফলন দেখা যাবে।
