বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন থেকে চলে যান আহসান এইচ মনসুর। বুধবার দুপুরে। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব অর্থনীতির দুই প্রান্ত—ওয়াশিংটন ও ঢাকা। কিন্তু একই সুরে উঠছে এক প্রশ্ন: কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা স্বাধীন? যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের হুমকি, আর ঢাকায় বিক্ষোভের মুখে গভর্নর বিদায়—দুই ঘটনাই আলোচনায় এনেছে মুদ্রানীতির সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ।
ওয়াশিংটনে নজিরবিহীন চাপ- যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক Federal Reserve–এর চেয়ারম্যানকে সরানো নিয়ে অতীতে কোনো প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য হুমকির নজির নেই। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে Donald Trump একাধিকবার চেয়ারম্যান Jerome Powell–কে অপসারণের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর।
যদিও পাওয়েল এখনো দায়িত্বে আছেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে ভবন সংস্কার ইস্যুতে কংগ্রেসকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে অর্থনীতিবিদ Kevin Warsh–এর নাম সামনে আনা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
ঢাকায় বিক্ষোভ, গভর্নরের আকস্মিক বিদায়
বুধবার ঢাকায় ঘটে যায় এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক–এর একদল কর্মকর্তার বিক্ষোভের মুখে পদ ছাড়েন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
তার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান–কে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হলেন—যা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার মনসুরকে নিয়োগ দিয়েছিল। এর আগে তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠান Policy Research Institute–এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হঠাৎ অপসারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রশ্ন।
অর্থমন্ত্রীর ব্যাখ্যা: “স্বাভাবিক পরিবর্তন”
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিবর্তনকে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ভাষায়, সরকার পরিবর্তনের পর নীতিগত সামঞ্জস্য আনতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক।
তবে সমালোচকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন—নির্বাচনী ইশতেহারেই ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদারের প্রতিশ্রুতি ছিল। নতুন গভর্নরের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
নিয়োগের নিয়ম: আইনে ফাঁকফোকর বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী গভর্নর নিয়োগের যোগ্যতা নির্দিষ্ট নয়; সরকারই নিয়োগকারী। ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকছে বিস্তর।
মনসুর দায়িত্বে থাকাকালে গভর্নরের মর্যাদা মন্ত্রীর সমপর্যায়ে উন্নীত ও নিয়োগপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রস্তাব দিলেও তা বাস্তবায়নের আগেই তাঁকে বিদায় নিতে হলো।
অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা: আস্থার সংকট?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান মনে করছেন, সংস্কার প্রক্রিয়ার মাঝপথে এমন পরিবর্তন ব্যাংকিং খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
তাঁর মতে, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে—যা পুরো অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।
ওয়াশিংটন থেকে ঢাকা: একই প্রশ্ন- দুই দেশের ঘটনা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের হলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—রাজনৈতিক প্রভাব বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি অর্থনীতির স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
পর্যবেক্ষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শুধু নীতিগত বিষয় নয়; এটি বাজারের আস্থা, বিনিয়োগ প্রবাহ ও আর্থিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। তাই গভর্নর বদলের এই নাটকীয় অধ্যায় শেষ নয়—বরং নতুন বিতর্কের সূচনা।
