গণপূর্ত অধিদপ্তর—রাষ্ট্রের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান দপ্তর। অথচ অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের আমলে এই দপ্তরই পরিণত হয়েছিল লুটপাট ও টেন্ডার সিন্ডিকেটের নিরাপদ অভয়ারণ্যে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বহু প্রকৌশলী বরখাস্ত, বদলি ও মামলার মুখে পড়লেও বিস্ময়করভাবে অদৃশ্য ক্ষমতার ছত্রছায়ায় বহাল তবিয়তে রয়েছেন বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল আমিন মিয়া—যাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ যেন শেষই হচ্ছে না।
অভিযোগের পাহাড়, তবুও অটুট পদচারণা-
ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুরুল আমিন মিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় শীর্ষ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সরকারি প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ, নিম্নমানের কাজ, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং টেন্ডার কারসাজির বিস্ফোরক তথ্য। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা পড়েছে একাধিক লিখিত অভিযোগ, তদন্তেও উঠেছে অনিয়মের প্রমাণ—তবু প্রশ্ন একটাই:কেন তিনি এখনও অক্ষত? কার ছায়া তাকে রক্ষা করছে?
ক্যারিয়ারের শুরুতেই দুর্নীতির ছাপ-
কুমিল্লার ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোল্লা ইউনিয়নের ভাওয়াল গ্রামের বাসিন্দা নুরুল আমিন মিয়া ১৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরির শুরু থেকেই তিনি ঠিকাদার সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়মের জাল বিস্তার করেন। বিগত সরকারের একাধিক প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রী ও এমপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শাস্তি নয়—বরং পেয়েছেন পদোন্নতি। বাতিল দরপত্র পুনর্জীবিত করে কোটি টাকা আত্মসাৎ
রাজধানীর উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরে গণপূর্তের আবাসিক ভবনের একটি বাতিল দরপত্র পুনরায় অনুমোদনের ঘটনায় বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ৩০-৪০ লাখ টাকার কাজ দেখানো হয় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা—অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। তদন্তে অনিয়ম ধরা পড়লেও রহস্যজনকভাবে তা ধামাচাপা পড়ে।
১০ কোটি টাকার ঘুষ ও টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ
১২০ কোটি টাকার বহুতল অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নুরুল আমিন মিয়ার বিরুদ্ধে। দরপত্র আইডি ১১২০৮৫৩ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর দুদকের অভিযানে তার নাম উঠে আসে। পরে মন্ত্রণালয় দরপত্র বাতিল করলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন আইডি (১২০৭৪৯৯) দিয়ে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়—যা নিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন বিতর্ক।
সিন্ডিকেটের বিশ্বস্ত মুখ- চট্টগ্রাম গণপূর্ত-৩ এ দায়িত্ব পালনকালে টেন্ডার কমিশন বাণিজ্য ও প্রকল্প লুটপাটের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দপ্তরের ভেতরে তাকে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়। বদলি বাণিজ্য থেকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন—সবখানেই ছিল তার প্রভাবের অভিযোগ।
অবৈধ সম্পদের বিস্ময়কর তালিকা-
পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা সীমিত থাকলেও চাকরিজীবনে হঠাৎ সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে—
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস (উচ্চ ভাড়া)
গুলশানে কয়েক কোটি টাকার নতুন ফ্ল্যাট (ইন্টেরিয়রসহ কোটি টাকা ব্যয়)
কুমিল্লার গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়ি ও শহরে সম্পদ-
স্ত্রী-সন্তানদের নামে গাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট ও ব্যাংক আমানত। অভিযোগ রয়েছে, আইনের চোখ ফাঁকি দিতে স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়দের নামে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, বিচার নেই
গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নুরুল আমিন মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়—কিন্তু রহস্যজনকভাবে প্রতিবারই তদন্ত থেমে যায়। সাংবাদিকদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন না, ফোন ধরেন না—রয়েছেন নীরবতার আড়ালে।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবশ্য জানিয়েছেন, প্রকাশিত অভিযোগ ও পূর্বের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিললে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রশ্ন এখন রাষ্ট্রের প্রতি-
দুর্নীতির অভিযোগে যখন একের পর এক কর্মকর্তা শাস্তির মুখে, তখন নুরুল আমিন মিয়ার মতো বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
অভিযোগের পাহাড় কি আবারও চাপা পড়বে? নাকি নতুন তদন্তে উন্মোচিত হবে গণপূর্তের অন্ধকার সাম্রাজ্য? এমন প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে নেটিজেনরা।
