সোমবার, ১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চীনের সঙ্গে চুক্তি করে কানাডা কি যুক্তরাষ্ট্রের বলয় ছাড়ছে

অনলাইন ডেস্ক
জানুয়ারি ১৮, ২০২৬ ১১:০৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের জন্য দ্য গ্রেট হলে যান কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। গত শুক্রবার বেইজিংয়ে। ছবি: এএফপি

কানাডার পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতি ফুটে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির একটি বাক্যে। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্ব যেভাবে চলছে, সেটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। নিজেদের মতো করে চাইলে আর হবে না।

গত শুক্রবার চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পর করা এক প্রশ্নের জবাবে কার্নি এমন মন্তব্য করেছিলেন। এর আগে চীনের সঙ্গে যখন সম্পর্ক শীতল ছিল, তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ও নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে হুমকিজনক হিসেবে উল্লেখ করেছিল কানাডা। কিন্তু এখন সেই চীনকে বাণিজ্য অংশীদার বানানো হচ্ছে।

শি জিনপিং ও মার্ক কার্নির মধ্যে বেইজিংয়ে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, কানাডা চীনের ইলেক্ট্রনিক পণ্যের ওপর শুল্ক ছাড় দেবে। বিনিময়ে চীন কানাডার কৃষিপণ্যের শুল্ক কমাবে। চীনের প্রতি কানাডার নীতির এমন নমনীয়তাকে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক বাণিজ্য পরামর্শক ও রিডো পটোম্যাক স্ট্র্যাটেজি গ্রুপের সভাপতি এরিক মিলার বিবিসিকে বলছেন, মার্ক কার্নি তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, কানাডারও এখন সক্রিয় ভূমিকা রাখার মতো অবস্থা আছে। তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বসে থাকবে না।শুক্রবার সাংবাদিকদের কার্নি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব বদলে গেছে। নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় চীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি কানাডার জন্যই ভালো হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আরও অনুমেয় হয়েছে।’ পরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কার্নি লিখেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগত, বাস্তবসম্মত ও দৃঢ়ভাবে কার্যকরের চেষ্টা করা হচ্ছে।

চীনের শুল্কের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন কানাডার সাসকাচোয়ান প্রদেশের ক্যানোলা তেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষকরা। শুক্রবার প্রদেশটির গভর্নর স্কট মো বাণিজ্য চুক্তির খবরকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি কৃষকদের নির্ভার করবে।

কিন্তু অন্টারিওর গভর্নর ডগ ফোর্ডের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক। কারণ, তাঁর প্রদেশে সবচেয়ে বেশি অটোমোবাইল খাতের পণ্য তৈরি হয়। ফোর্ড বলেন, চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর থেকে শুল্ক ছাড় দেওয়াটা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বিপাকে ফেলবে। অনেকে চাকরি হারাবেন।

এক্সে দেওয়া পোস্টে ডগ ফোর্ড বলেন, মার্ক কার্নি চীনের সস্তা মানের বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি করতে যাচ্ছেন। অথচ স্থানীয় পর্যায়ে বিনিয়োগের কোনো নিশ্চয়তা দাবি করেননি।

মন্ট্রিলের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিবেক আস্তভানস বলছেন, শুল্ক ছাড় দেওয়ার কারণে কানাডার বৈদ্যুতিক গাড়ির অন্তত ১০ শতাংশ বাজার চীনা ব্যবসায়ীদের হাতে যাবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান টেসলার ওপরও চাপ তৈরি হবে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি কানাডায় তাদের বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মূলত এমন অবস্থা তৈরি করে মার্ক কার্নি ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি সংকেত দিতে চেয়েছেন।

এখন পর্যন্ত চীন-কানাডার চুক্তি নিয়ে হোয়াইট হাউস থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। সিএনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিটিকে ‘সমস্যাজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে ভালো কিছু হিসেবে প্রশংসা করেছেন। হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কেউ যদি চীনের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে, তাহলে তা করা উচিত।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার ধাতব ও অটোমোবাইল খাতের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। যা এক ধরনের অনিশ্চতায় তৈরি করে। একই সঙ্গে তিনি কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি অবসানেরও হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, এটি আর প্রাসঙ্গিক নয়।

কানাডা ও মেক্সিকো এখনো চুক্তিটি ধরে রাখতে চায়। রিডো পটোম্যাক স্ট্র্যাটেজি গ্রুপের এরিক মিলার বলছেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্ক কার্নির নতুন চুক্তি ‘উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির’ ভবিষ্যতকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি (মোট উৎপাদনের ৭০%) বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন করে। কানাডার সঙ্গে তাদের চুক্তি অনুযায়ী, মার্ক কার্নির প্রশাসন প্রথম বছরে ৪৯ হাজার গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে বন্দরে শুল্ক নির্ধারণ করেছে মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশ। আগে যা ছিল প্রায় ১০০ শতাংশ। বিপরীতে আগামী ১ মার্চ থেকে চীন ক্যানোলা তেল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ৮৪ থেকে ১৫ শতাংশে নামাবে। কানাডার পাসপোর্টধারী কারও চীন ভ্রমণের সময় ভিসার শর্তও উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক গল রাজ বলছেন, চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) কানাডার বাজারে ঢোকার অর্থ- ভোক্তারা অল্প দামে কিনতে পারবেন। তবে কার্নি সরকার যদি অভ্যন্তরীণ বাজারকে স্বাভাবিক রাখার মতো পদক্ষেপ না নেন তাহলে, স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।

কানাডা কেন চীনের ইভিকে বাজারে ঢুকতে দিচ্ছে? এমন প্রশ্ন করা হলে গত শুক্রবার মার্ক কার্নি বলেন, চীন স্বল্প মূল্য ও জ্বালানি সাশ্রয়ী যান উৎপাদন করে। তিনি আশা করছেন, এই চুক্তি চীনা বিনিয়োগকারীদেরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।

কানাডা যখন চীনের দিকে ঝুঁকছে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যেও ইতিবাচক সংকেত মিলেছে। কার্নির বেইজিং সফরের আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প চীনা বিনিয়োগের ব্যাপারে উদারনীতির কথা বলেন। ডেট্রয়েট ইকোনমিক ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, চীন যদি এখানে (যুক্তরাষ্ট্র) এসে কারখানা তৈরি করে, মানুষকে চাকরি দেয়, তাহলে তাদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী এপ্রিলে বেইজিং সফর করতে পারেন। এর আগে তিনি শি জিনপিংকেও যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অন্যদিকে মার্ক কার্নির জন্য গত শুক্রবারের চুক্তিটি সম্পর্ক সমন্বয় প্রক্রিয়ার একটি প্রথম ধাপ মাত্র।

(বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অবলম্বনে)

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।