রিয়া চক্রবর্তী | ছবি:সংগৃহীত
একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর স্বাভাবিক জীবন। লাইট জ্বলে উঠলেই বদলে যেত রিয়া চক্রবর্তীর পরিচয়—তিনি তখন নায়িকা, স্বপ্নবাজ এক তরুণী। ‘সোনালি কেবল’, ‘চেহরে’, ‘জালেবি’র মতো বলিউড ছবিতে অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা পাকা করছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল, সামনে শুধু উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
কিন্তু ২০২০ সাল এসে সেই গল্পে হঠাৎ করেই নামিয়ে দেয় ভয়াবহ পর্দা।
বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতের আকস্মিক মৃত্যুর পর এক মুহূর্তেই বদলে যায় রিয়ার জীবন। যে মুখ একসময় রুপালি পর্দায় দেখা যেত, সেই মুখই রাতারাতি জড়িয়ে পড়ে বিতর্ক, অভিযোগ আর সন্দেহের ঘন কুয়াশায়। অভিনয়জীবন তো বটেই, ব্যক্তিজীবনও ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের জায়গা দখল করে নেয় আদালতের কাঠগড়া, পুলিশের গাড়ি আর টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ।
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ছয় বছর। এই সময়টায় রিয়া ছিলেন প্রায় অদৃশ্য। বড়পর্দা নয়, ছোটপর্দার নাটকীয় চরিত্রও নয়—তিনি ছিলেন খবরের শিরোনামে বন্দি এক বাস্তব মানুষ। এক মাস কাটাতে হয়েছিল সংশোধনাগারে। চার দেয়ালের ভেতর ভেঙে পড়েছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস, নিজের অস্তিত্ব নিয়েই জেগেছিল প্রশ্ন। জনমতের আদালতে প্রতিদিন চলেছে তাঁর বিচার—যেখানে রায় আগেই লেখা ছিল।
তবু জীবন থেমে থাকে না। আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে নীরবে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন রিয়া। ক্ষত সারিয়েছেন, টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শেষে গত বছর অবশেষে আদালত থেকে ক্লিনচিট পান তিনি। কোনো উদযাপন নয়, কোনো বিজয়োল্লাস নয়—শুধু এক গভীর, নিঃশব্দ স্বস্তি। যেন বহুদিন পর বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার অধিকার।
আর সেই শ্বাসের সঙ্গেই ফিরছে পুরোনো পরিচয়—অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী।
সম্প্রতি নেটফ্লিক্স তাদের আসন্ন প্রকল্পগুলোর ঘোষণা দিয়েছে। সেখানেই জায়গা করে নিয়েছে নতুন ওয়েব সিরিজ ‘ফ্যামিলি বিজনেস’। এই সিরিজ দিয়েই ছয় বছর পর পর্দায় ফিরছেন রিয়া। তাঁর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে অনিল কাপুর ও বিজয় বর্মাকে—অভিজ্ঞতা আর নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী অভিনয়ের এক আকর্ষণীয় মেলবন্ধন। ঘোষণা প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে টিজার শেয়ার করে নিজের উত্তেজনা লুকাননি রিয়াও।
তবে এই প্রত্যাবর্তন শুধু নতুন একটি কাজ পাওয়ার গল্প নয়—এটি টিকে থাকার গল্প, নিজেকে আবার দাঁড় করানোর গল্প।
এক সাক্ষাৎকারে রিয়া বলেছিলেন, অভিনয়ই আমার পরিচয়। এত কিছুর পরেও আবার কাজে ফিরতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
আর ট্রল প্রসঙ্গে তাঁর কথায় ছিল তীক্ষ্ণ বাস্তবতা—“আজকাল ট্রল না হলে মনে হয়, আমি ঠিক কিছু করছি না!
সুশান্তের মৃত্যুর পর তাঁর জেলে যাওয়ার দৃশ্য টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিল কোটি কোটি মানুষ। সেই স্মৃতি আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। রিয়ার আক্ষেপ, সেই বিপুল দর্শকের মধ্যে যদি অন্তত অল্প কিছু মানুষও বুঝত—আদালত থেকে ক্লিনচিট পাওয়ার প্রকৃত অর্থ কী।
‘ফ্যামিলি বিজনেস’-এর মাধ্যমে রিয়া চক্রবর্তীর পর্দায় ফেরা তাই শুধু একটি ওয়েব সিরিজের খবর নয়। এটি তাঁর নিজের গল্পটা আবার নিজের মতো করে বলার চেষ্টা। ছয় বছরের অন্ধকারের পর এই আলো কতটা উজ্জ্বল হবে, তা সময়ই ঠিক করবে।
তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত—ক্যামেরার সামনে আবার দাঁড়িয়ে রিয়া প্রমাণ করেছেন, ভেঙে পড়লেও হার মানেননি তিনি।
