লৌহজংয়ে মঙ্গলবার দুর্নীতিবাজমুক্ত ভূমি অফিসের দাবিতে মানববন্ধন করেন স্থানীয়রা। ছবি : সংগৃহীত
মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে জমে উঠেছিল ক্ষোভ, আর সেই ক্ষোভই একসময় রূপ নেয় প্রতিবাদের উত্তাল ঢেউয়ে। ভুক্তভোগী মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা বেদনা যেন একসাথে বিস্ফোরিত হয় মানববন্ধন আর বিক্ষোভের মাধ্যমে। আর সেই ঝড়েই ভেসে গেল পদ—প্রত্যাহার করা হলো উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বাসিত সাত্তারকে। একই সঙ্গে ক্লোজড করা হয়েছে তার অফিসের দুই কর্মচারীকেও।
গত বুধবার ভূমি মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন শাখার এক প্রজ্ঞাপনে তাকে রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় বদলি করা হয়। মাত্র ছয় মাস আগে, ১২ অক্টোবর, দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি লৌহজংয়ে—কিন্তু এই অল্প সময়েই অভিযোগ আর ক্ষোভের পাহাড় জমে ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এর আগের দিন, মঙ্গলবার—ভোরের নরম আলো ফোটার আগেই জমে ওঠে মানুষের ভিড়। লৌহজং উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে তারা জানায় তাদের ক্ষোভ, তাদের হতাশা। মানববন্ধনের ব্যানারে লেখা ছিল অভিযোগের গল্প, চোখে ছিল ন্যায়ের আকুতি। ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে তারা দাবি তোলে—অপসারণ করতে হবে অভিযুক্তদের।
কিন্তু নাটকের মোড় ঘুরে যায় দ্রুতই। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আসে সিদ্ধান্ত—এসিল্যান্ড বাসিত সাত্তারকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে অফিসের সহকারী (উমেদার) ইমন হোসেন ও গাড়িচালক আল-আমিনকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্লোজড করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু নিশ্চিত করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে—সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রস্তুতি চলছে নীরবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইমন হোসেন যেন হয়ে উঠেছিলেন ক্ষমতার ছায়া—এসিল্যান্ডের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করতেন টাকা। কাগজে ভুলের ভয় দেখিয়ে কেড়ে নিতেন স্বপ্নের সঞ্চয়। আর গাড়িচালক আল-আমিন—সেও নাকি একই ছকে বুনেছিলেন লোভের জাল, এক বালু ব্যবসায়ীর কাছে দাবি করেছিলেন ছয় লাখ টাকা।
এই গল্প শুধু দুর্নীতির নয়, এটি মানুষের দীর্ঘশ্বাসের গল্পও। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক তোফাজ্জল হোসেন বাদল বলেন, নামজারি নিয়ে সাধারণ মানুষকে অনেক হয়রানি করা হয়েছে।
বালু ব্যবসায়ী অরুণ মাঝির কণ্ঠে ক্ষোভের সাথে মিশে ছিল ক্লান্তি—“সব বৈধ থাকার পরও আমাদের কাছে টাকা দাবি করা হয়েছে। আর পিয়ারা বেগমের কথায় ফুটে ওঠে অসহায়ত্ব—সব কাগজ ঠিক, তবুও মাসের পর মাস ঘুরতে হয়েছে।
তবে শেষটা যেন একটুখানি স্বস্তির। এসিল্যান্ডের প্রত্যাহার আর দুই কর্মচারীর ক্লোজড হওয়ার খবরে স্থানীয়দের মনে ফিরেছে আশার আলো—যেন দীর্ঘ অন্ধকার শেষে একটু ভোরের আভা। এই গল্পে প্রেম নেই, তবু আছে মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার এক গভীর টান—ন্যায়ের প্রতি এক অবিচল ভালোবাসা।
