ঢাকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন–এর অঞ্চল-৩ কার্যালয়কে ঘিরে টেন্ডার বাণিজ্য, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে। এক ভুক্তভোগী ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আর্থিক সুবিধা দাবি, প্রশাসনিক হয়রানি এবং বিল পরিশোধে অযৌক্তিক বিলম্বের মতো একাধিক অভিযোগ—যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগের মূল বিষয়বস্তু : কাজের বিনিময়ে ‘শতাংশ’ দাবি,এ যেন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ভাগ।
লিখিত অভিযোগে ঠিকাদার দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন নিয়ম মেনে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করলেও সাম্প্রতিক একটি টেন্ডারে অংশ নিতে গিয়ে তিনি অস্বাভাবিক চাপের মুখে পড়েন। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বা শতাংশ দাবি করা হয়।
এই অনৈতিক দাবিতে সাড়া না দেওয়ায় দরপত্র বাতিলের চেষ্টা, অযৌক্তিক শর্ত আরোপ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দরপত্র বাতিল ও প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, টেন্ডার জমা দেওয়ার পর বিভিন্ন অজুহাতে তা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে বিলম্ব করা হয়। এমনকি অপ্রাসঙ্গিক আপত্তি তুলে তাকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে তিনি চলমান প্রকল্পের কাজ থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
সিকিউরিটি ডিপোজিট আটকে রাখা ও অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ- অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পূর্বে সম্পন্ন একটি প্রকল্পের নিরাপত্তা আমানত (সিকিউরিটি ডিপোজিট) নিয়ম অনুযায়ী ফেরত না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা হয়েছে। ডিফেক্ট লাইয়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরও নতুন করে অর্থ দাবি করা হয়েছে—যা সরকারি ক্রয় বিধিমালার পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিল পরিশোধে বিলম্ব ও আর্থিক সংকট-
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর বিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও নানা অজুহাতে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। এতে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়।
অভিযোগ প্রত্যাহারে চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর তার ওপর মানসিক চাপ ও হুমকি সৃষ্টি করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রত্যাহার না করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা-
অভিযোগকারী বলেন, এ ধরনের অনিয়ম শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নষ্ট করছে, প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করছে এবং দক্ষ ঠিকাদারদের নিরুৎসাহিত করছে। এতে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও প্রকল্পের মান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
অনিয়মের অভিযোগে বক্তব্য মেলেনি অভিযুক্ত কর্মকর্তার-
অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিবের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
তারা আরও মতামত প্রদান করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে তারা ভয়ভীতি ছাড়াই অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন।
অভিযোগকারীর প্রত্যাশা পূরণে এ অভিযোগ জমা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। অভিযোগকারী আশা প্রকাশ করেছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তার আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণ ও ভবিষ্যতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগটির সুষ্ঠু তদন্ত হলে তা শুধু একটি অনিয়মের বিচারই নয়—বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
