ডেলসি রদ্রিগেজ, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ফাইল ছবি: এএফপি
নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কেমন হবে- তা জানতে অপেক্ষায় কয়েক কোটি নাগরিক। অপরদিকে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন পাওয়ার জন্য লড়াই শুরু করেছেন দুই নেত্রী।
এক পক্ষে আছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। বিগত বছরগুলোতে মাদুরোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভেনেজুয়েলায় ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টার জন্য’ তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন। মাদুরোর পতনের কয়েকদিন আগে থেকে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন। নোবেল পুরস্কার নিতে যান নরওয়েতে।
আরেক পক্ষে আছেন, ডেলসি রদ্রিগেজ। মাদুরো প্রশাসনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এখন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁকে মাদুরোর দৃঢ় সমর্থক হিসেবে দেখা হয়। বর্তমানে ওয়াশিংটনকে সন্তুষ্ট এবং দেশে মাদুরো অনুগতদের সমর্থন ধরে রাখার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন।
মাচাদো ও রদ্রিগেজের মধ্যে ক্ষমতা পাওয়া ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায়; কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দুই হাজার মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থান করছেন। বলা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলা চালানোর ঘোষণা দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত- কারাকাসে নেতৃত্বের ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করতে পারে।
খালি চোখে দেখলে, এই প্রতিযোগিতায় রদ্রিগেজকে এগিয়ে থাকতে দেখা যাবে। তিনি এরই মধ্যে ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন। অপরদিকে ট্রাম্প সরাসরি মাচাদোকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এরপর মাচাদো একেবারে পিছিয়ে নেই। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে তাঁর শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী আছে।
কোনো বিশ্ব নেতার সঙ্গে ট্রাম্পের আলাপের ধরনগুলো খেয়াল করলে দেখা যায়, তিনি খুব দ্রুত মতামত বদলান। প্রশংসামূলক বাক্য পর মুহূর্তেই হুমকিতে রূপ নেওয়া কিংবা উল্টোটাও ঘটতে পারে। এ অবস্থায় হোয়াইট হাউসে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মাচাদোর সঙ্গে হওয়া ট্রাম্পের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নোবেল পুরস্কার ও দরকষাকষির হাতিয়ার-
মাচাদো ও রদ্রিগেজ- দুজনেই সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। গত বুধবার ট্রাম্প ফোনে রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁকে একজন দারুণ ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। জানান, তাঁদের সম্পর্ক খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে।
এ অবস্থায় মাচাদো আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বৃহস্পতিবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক ট্রাম্পকে উপহার দিয়েছেন। ট্রাম্পও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ট্রাম্পের সমর্থন পেতে মাচাদোর এই শান্তি পুরস্কার বিনিময় যেন দরকষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এমন পদক্ষেপ ছাড়াও মাচাদোকে এগিয়ে রাখতে হাত বাড়াতে পারেন মার্কো রুবিও। হোয়াইট হাউসের এই প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাচাদোর অন্যতম মিত্র। রুবিও বিভিন্ন সময় এই নেত্রীর কাজের প্রশংসা করেছেন। গত বছর নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁকে মনোনয়নও দিয়েছিলেন।
বিপজ্জনক দ্বিমুখী খেলা
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি কোনো এক সময় রদ্রিগেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী। কিন্তু রদ্রিগেজ ট্রাম্পের প্রশংসার পাশাপাশি মাদুরোকে তুলে নেওয়ার নিন্দাও করেছেন। এরপরই ট্রাম্প হুমকি দেন এবং রদ্রিগেজ চাপের মুখে তুলনামূলক সমঝোতার সুরে কথা বলতে শুরু করেন। সমঝোতার ইঙ্গিত হিসেবে তাঁর সরকার কয়েকজন হাই-প্রোফাইল বন্দিকে মুক্তি দিতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আমেরিকানও আছেন।
মাদুরোর শাসনামলে রদ্রিগেজের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব থাকলেও তিনি বছরের পর বছর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে তেলের মাধ্যমে। ২০১৭ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ভেনেজুয়েলা তাদের তেল সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রাম্পের অভিষেক তহবিলে পাঁচ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিল। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক কোটি ব্যারেল তেল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। ২০১৯ সালে বন্ধ হওয়া মার্কিন দূতাবাস ফের চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জন ম্যাকনামারাকে সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।
এখন পর্যন্ত হোয়াইট হাউসকে কাছে টানার ক্ষেত্রে তাঁর এসব প্রচেষ্টা ফল দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির খবরও সামনে এসেছে।
তবে রদ্রিগেজ খুবই কঠিন এক দ্বিমুখী খেলা খেলছেন বলে মনে করেন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের লাতিন আমেরিকা স্টাডিজের ফেলো উইল ফ্রিম্যান। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে হবে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে এবং তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করছেন। একই সঙ্গে নিজ দেশে কট্টর মাদুরোপন্থী নেতা ও সামরিক বাহিনীর কাছেও বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে হবে। এক কথায় বললে, রদ্রিগেজ এখন দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছেন। কতদিন হাঁটতে পারেন সেটিই দেখার বিষয়।
(বৃহস্পতিবার সিএনএন-এর এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মারিয়া কোরিনা মাচাদোর বৈঠকের আগে। শুক্রবার ভাষান্তরের সময় বৈঠক হওয়ার অংশটি যুক্ত করা হয়েছে।)
