অনলাইনে বাড়ি ভাড়া, রাতভর ডিজে পার্টি—উদ্ধার মদ, গাঁজা, ইয়াবা ও কনডম; সদর দপ্তরে সংযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি। ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি
রাজধানীর ভাটারায় পুলিশ কর্মকর্তার ভাড়া দেওয়া বাড়িতে ডিজে পার্টির নামে মাদক সেবন ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলার অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উত্তরা বিভাগ। সোমবার গভীর রাতে পুলিশ হাউজিং-১ এলাকার ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৮ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণী। তাঁদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়েও রয়েছেন। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিকও আছেন।
অভিযানে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, কনডম এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে ডিবি পুলিশ। ঘটনাটি সামনে আসার পর বাড়িটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। এদিকে ভাটারার মতো এলাকায় সাড়ে ছয় কাঠা জমিতে বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পাঁচ কক্ষের বাড়িতে রাতভর পার্টি
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এর ওই বাড়িটি তিনতলা। সাড়ে ছয় কাঠা জমির একাংশে নির্মিত বাড়িটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘এয়ারবিএনবি’র মাধ্যমে স্বল্প সময়ের জন্য ভাড়া দেওয়া হতো। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি বাড়িটি ভাড়া নিয়ে রাতযাপন কিংবা ডিজে পার্টির আয়োজন করতেন।
বাড়িটি দেখভালের জন্য মাহবুব আলম নামে একজনকে কো-হোস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ আল জহির। অভিযোগ রয়েছে, বাড়িটি ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন পার্টির আড়ালে মাঝেমধ্যেই মাদক সেবনসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলত।
গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এর ওই বাড়িতে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলার তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় নারী-পুরুষসহ ৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে। বাড়িটি থেকে মদ, গাঁজা, কনডম ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি জানান, বাড়িটিতে মোট পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। অনলাইনে বুকিংয়ের মাধ্যমে এসব কক্ষ ভাড়া দেওয়া হতো। একটি কক্ষ ১০ জন মিলে ভাড়া নিতেন। এর বাইরে অতিরিক্ত লোকজনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি নেওয়া হতো বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা কিংবা ১১টা পর্যন্ত এসব পার্টি চলত। মাসে ১৮ থেকে ২০টি অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া বাবদ প্রায় এক লাখ টাকা নেওয়া হতো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আয়ের ৭০ শতাংশ যেত মালিকের অ্যাকাউন্টে
বাড়িটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দিয়ে আয় করতেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাড়ি ভাড়া থেকে অর্জিত আয়ের ৭০ শতাংশ তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা হতো।
এয়ারবিএনবি এমন একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস, যার মাধ্যমে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা নির্দিষ্ট কক্ষ স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাড়া দেওয়া যায়। অতিথিরা এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাসস্থান বুকিং করেন। তবে ওই বাড়িতে ভাড়া নেওয়ার পর কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলত, তা তদারকির দায়িত্ব নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, বাড়িটিতে দীর্ঘদিন ধরে অবাধে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চললেও তা নিয়ে কার্যকর নজরদারি ছিল কি না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে বাড়িটির জমি কেনা ও নির্মাণের অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব বিষয়ে কোনো অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
জন্মদিনের পার্টির কথা বলে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল: জহির
অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির যুগান্তরকে বলেন, তিনি অনলাইনে বাড়িটি ভাড়া দিয়ে থাকেন এবং ভাড়াটিয়াদের জন্য কিছু কঠোর নিয়মও রয়েছে। সেখানে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তিনি দায় এড়াতে পারেন না। তবে অসৎ উদ্দেশ্যে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হতো না বলে দাবি করেন তিনি।
আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, দেশি-বিদেশি অনেকেই বাড়িটি ভাড়া নেন। কেউ ভাড়া নিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করলে অতীতেও তা প্রতিহত করা হয়েছে। এবার জন্মদিনের পার্টির কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা মদ নিয়ে এসে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাবেন, তা তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন।
পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি
ঘটনার পর মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সই করা অফিস আদেশে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখা থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে ডিবি জানিয়েছে, রাতভর ডিজে পার্টি, মাদক সেবন ও মাদকের কারবার পরিচালিত হওয়ার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিক রয়েছেন। বাড়িটি থেকে মাদকদ্রব্য ও মাদক সেবনের সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তবে এ ঘটনায় শুধু পার্টিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ভূমিকা নয়, অনলাইনে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার পর সেখানে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে, তা তদারকির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
