জাল জালিয়াতি,মিথ্যাচার,দলবাজি,তেলবাজি,ঘুষ বাণিজ্য,এমনকি এক সাথে সরকারী দুই চাকরি করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন ঢাকা ওয়াসার ২ নম্বর জোনের রাজস্ব কর্মকর্তা এএমএম ইকরাম। তার অপকর্মের ফলস্বরূপ সংশ্লিষ্ট মহলে তিনি ”ঢাকা ওয়াসার ইবলিশ আখ্যা পেয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, তথ্য গোপন করে একই সঙ্গে ঢাকা ওয়াসায় কর্মকর্তা এবং নোয়াখালী পৌরসভার সচিব পদে চাকরি করেছেন এএমএম ইকরাম।এই ধরনের জালিয়াতি বাংলাদেশে বিরল। দুই জায়গা থেকে টানা ৯ বছর বেতনও তুলেছেন। অবশেষে ধরা পড়ার পর তিনি পৌরসভার চাকরিটি ছেড়ে দিয়েছেন। ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ শাস্তি হিসাবে তাকে নিম্নতর বেতন স্কেলে নামিয়ে দিয়েছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী তার চাকরিই থাকার কথা নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০১ সালে উচ্চমান সহকারী (ইউডিএ) পদে ওয়াসায় যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুটি পদোন্নতি বাগিয়ে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা বনে যান। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তিনি চাকরিচ্যুতির শাস্তি থেকে রেহাই পেয়েও ক্ষান্ত হননি। বেশকিছু দিন তিনি উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (ডিসিআরও) পদে পদোন্নতির জন্য দেনদরবার শুরু করেছেন।অথচ তা রাজস্ব কর্মকর্তা হওয়ার যোগ্যতাই নাই।
এদিকে ইকরামের কয়েকজন সহকর্মী ওয়াসা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। তদবির করে এএমএম ইকরাম তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন। জানা যায়, ২০০১ সালের ৯ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসায় ইউডিএ পদে ওয়াসায় যোগ দেন ইকরাম। শুরুতে তাকে ঢাকা ওয়াসার বোতলজাত পানি উৎপাদন প্ল্যান্টে তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে ইকরামের বিরুদ্ধে ওয়াসায় অভিযোগ জমা পড়ে। সেখানে বলা হয়, ইকরাম একই সঙ্গে নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব হিসাবে চাকরি এবং বেতন তুলছেন। পরে ইকরামকে সাময়িক বরখাস্ত করে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ধরা পড়ে ইকরামের তেলেসমাতি কারবার।
ঢাকা ওয়াসার প্রশাসন (সংস্থাপন) শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানান, সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা-১৯৭৯তে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো সরকারি কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক চাকরি করতে পারবেন না। কেউ করলে গুরুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
জানা যায়, ওয়াসায় কর্মরত থাকা অবস্থায় বিজ্ঞপ্তি দেখে ইকরাম নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব পদে আবেদন করেন। অংশ নেন লিখিত পরীক্ষায়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। ২০০৫ সালের ৭ জুন ইকরাম নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব পদে যোগ দেন। এরপর তিনি একই সঙ্গে দুই জায়গায় চাকরি করতে থাকেন। মাঝেমধ্যে তিনি নোয়াখালী পৌরসভায় অফিস করতেন। যখন যেতে পারতেন না, সেদিন তার মনোনীত একজন বহিরাগত তার হয়ে সেখানে কাজ করতেন। পৌরসভা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এভাবে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দুই জায়গা থেকেই বেতন তুলতে থাকেন ইকরাম। নোয়াখালী পৌরসভায় তার শুরুতে মূল বেতন স্কেল ছিল ৬ হাজার ৮০০ টাকা। ওয়াসায় শুরুতে মূল বেতন স্কেল ছিল ৫ হাজার ৫০০ টাকা। অভিযোগ জমা পড়ার পর ইকরামের কাছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানতে চাইলে প্রথমে অস্বীকার করেন। কিন্তু প্রশাসন তার জবাবে সন্তুষ্ট হতে না পারায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি করে। তখন এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসে। এই প্রতারণার কারণে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তখন তার বেতন স্কেল ৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। পাশাপাশি নোয়াখালী পৌরসভার চাকরিটি তাকে ছেড়ে দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়। পরে ইকরাম পৌরসভার চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকা ওয়াসায় থেকে যান। পাশাপাশি বরখাস্তকালীন বিনা বেতনে ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসাবে মঞ্জুর করে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগের সমর্থক পরিচয়ে বিতর্কিত এই কর্মকর্তা ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ওয়াসা তাকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। সেটা আবার ২০১৩ সাল থেকে কার্যকর করে ওয়াসা। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারিতে তাকে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে আবারও পদোন্নতি দেওয়া হয়। রাজস্ব কর্মকর্তার পদ প্রথম শ্রেণির। তবে এখন নিজেকে বিএনপির সমর্থক পরিচয় দিয়ে আরও উচ্চতর উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা পদে পদোন্নতির জন্য দেনদরাবার শুরু করেছেন। ওয়াসায় একসঙ্গে ৩২ জন উচ্চমান সহকারী নিয়োগ পান। তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার অবস্থানে ইকরাম ছিল ২৬ নম্বরে। তার আগের ২৫ জনের কেউ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পাননি। এ নিয়ে অন্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের এ ধরনের কাজ দুর্নীতি এবং ফৌজদারি অপরাধ। এ ধরনের ঘটনায় তার দুটি চাকরির কোনোটিই থাকার কথা নয়। তার বিরুদ্ধে দুদকে মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু ওয়াসা একটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাকে লঘুদণ্ড দিয়েছে। যারা তাকে লঘুদণ্ড দিয়েছে, তাদেরও বিচারের আওতায় আনা উচিত।
তাছাড়া,জালিয়াত সম্রাট এএমএম ইকরাম ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রেষণ ব্যতিরেকে পিপিআই প্রকল্পে ফিল্ড সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে। আইন বহির্ভূত হলেও পিপিআই প্রকল্প এবং ঢাকা ওয়াসা থেকে একই সাথে বেতন গ্রহন করতেন।
এএমএম ইকরাম এর স্ত্রী সালমা আক্তার মিনা ঢাকা ওয়াসার পিএন্ডডি সার্কেলে পিএ কাম কমপিউটার অপারেটর পদে মাস্টাররোলে ককর্মরত আছেন। তার স্ত্রীসহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের ঢাকা ওয়াসায় আউটসোসিং ও মাস্টাররোলে নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রেও নানা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এবিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্যে এএমএম ইকরাম এর মোবাইলে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
