আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্যবিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া খুবই ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’। তিনি বলেন , ‘নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে নিজেদের পছন্দনীয় লোক বসাবেন—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’
আজ সোমবার চিফ প্রসিকিউটরের পদ হারানোর পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তাজুল ইসলাম। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর বিদায়বেলায় ‘অম্লমধুর’ অনুভূতির কথা জানান সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী। এ সময় নতুন চিফ প্রসিকিউটরের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে আমি নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে স্বাগতম জানাই। তার প্রতি আমার শুভেচ্ছা থাকবে। তিনি যাতে আমাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনে সফল হন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং গত ১৫ বছরের গুম-খুনের বিচার প্রক্রিয়া যেন নতুন নেতৃত্বের অধীনে অব্যাহত থাকে, সেই প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাজুল ইসলাম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে আমার অনুভূতিটা অম্লমধুর। বাংলাদেশের একটা কঠিন সময়ে আমি এখানে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সেই সময়ের চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব নিই— আপনারা জানেন যে, এই মূল ভবনটি তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। একটা টিনশেডে কার্যক্রম চলছিল। তার আগের প্রসিকিউশনে যারা ছিলেন, তারা সব কিছু এলোমেলো রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বইপত্র, নথিপত্র বৃষ্টিতে ভিজছিল- এ রকম একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম।
সেখান থেকে হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের কাছ থেকে আলামত সংগ্রহ এবং গুমের তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন ও সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শহীদ পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আগে থেকে জানতেন কিনা এবং নিজে থেকে কেন পদত্যাগ করেননি— এমন প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে আমাদের প্রথমে বলা হয়েছিল যে, আমরা অ্যাজ ইট ইজ যেভাবে আছি, সেভাবেই চলবে। তারপর গতকালকে উনি (কারও নাম বলেননি) আসলে আমাকে ধারণাটা দিয়েছেন যে, সরকারের ইচ্ছা যে- এখানে নতুন কাউকে রিপ্লেস করার। তখন আমি নিজের থেকে বলেছিলাম যে তাহলে কি আপনারা চাচ্ছেন যে আমি পদত্যাগ করে চলে যাব? বলছেন না দরকার নাই। কারণ হচ্ছে যে, ন্যাচারাল প্রক্রিয়াতে রিপ্লেসড হবে। পদত্যাগ করলে এটা ভিন্ন বার্তা যেতে পারত। তাজুল ইসলামের ভাষায়, ‘যখনই একটা নির্বাচিত সরকার আসে, তারা কিন্তু তাদের পছন্দের লোকজনকে ন্যাচারালি রিপ্লেসড করেন—এটা অস্বাভাবিক আমি মনে করছি না। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া।
মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ (বেছে বেছে আসামি করা) করা হয়েছে কিনা— এমন প্রশ্নে সদ্যবিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে এ বিষয়টি বৈধ।
তিনি বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দুনিয়ার ইতিহাসে দেখবেন কোথাও গণহারে হাজার হাজার সৈন্যকে শাস্তি দেওয়া হয় না। সেখানে টপ কমান্ডারদের দেওয়া হয় এবং যারা একদম সরাসরি অ্যাট্রোসিটির সাথে ডাইরেক্ট ইনভলব (সম্পৃক্ত) ছিল তাদেরই সাজা দেওয়া হয়।
নিজের মেয়াদের বিচার ও রায়ের মান নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি খুব কনফিডেন্ট। যে রায় হয়েছে, যে ডকুমেন্ট আমরা প্রডিউস করেছি—এই ব্যাপারে উচ্চ আদালতে গিয়ে জাজমেন্ট উল্টে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতীতের ট্রাইব্যুনালের সমস্ত রেকর্ড ঘেঁটে দেখবেন, আমরা যে ধরনের শক্তিশালী প্রমাণ এখানে উপস্থাপন করেছি, এই ধরনের প্রমাণ কখনও উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
বিগত দেড় বছর ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান তাজুল ইসলাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কখনও গুম, হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত হবে না।
