বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেশে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্যারাসিটামল আমদানি

সমতল মাতৃভূমি ডেস্ক
ডিসেম্বর ২০, ২০২৫ ৩:৪২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

দেশে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্যারাসিটামল আমদানি। দেশে এই কাঁচামাল পর্যাপ্ত উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভারত ও চীন থেকে তা আমদানি করা হচ্ছে। এতে দেশের অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন উদ্যোক্তা ও ওষুধ প্রস্তুতকারকরা। তাদের আশঙ্কা, আমদানি অব্যাহত থাকলে জাতীয় এপিআই নীতির মূল লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

উদ্যোক্তারা জানান, জ্বর নিরাময়ে বহুল ব্যবহৃত ওষুধের এই কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা ১৯৯০ সালে অর্জন করেছে দেশের কোম্পানিগুলো। গণস্বাস্থ্য, নিপ ফার্মা, স্কয়ার, ইনসেপ্‌টা, গ্লোবাল ফার্মাসিউটিক্যালসসহ প্রায় ১০টি কোম্পানি এই কাঁচামাল প্রস্তুত করে। দেশীয় কারখানাগুলোতে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫০ টন প্যারাসিটামল এপিআই উৎপাদন সম্ভব। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশের পুরো চাহিদা দেশীয় উৎপাদন দিয়েই পূরণ করা যাবে।

তবে ২০২১ সালে করোনা মহামারির সময় হঠাৎ করে প্যারাসিটামলের (কাঁচামাল) চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে যায়। সেই সময় দেশীয় প্যারাসিটামলের মূল্য বাড়ানো হয়নি। এতে লোকসানের মুখে পড়ে গণস্বাস্থ্যসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। সংকট মোকাবিলায় তখন কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন দেয় ঔষধ প্রশাসন। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, জরুরি পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার পাঁচ বছর পার হলেও এখনও আমদানি বন্ধ করা হয়নি।

এমন বাস্তবতায় গত ২৭ নভেম্বর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে ওষুধের কাঁচামাল প্রস্তুতকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএআইএমএ) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) নেতারা বৈঠকে বসেন। তারা কাঁচামাল আমদানি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান।

বৈঠকে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, বেক্সিমকোর প্রয়োজনীয় প্যারাসিটামল কাঁচামাল প্রস্তুত করত ফার্মা টেক। গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে তারা যে পরিমাণ কাঁচামাল দেশে উৎপাদন করত, কেবল সেই পরিমাণই আমদানির অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত চাহিদা থাকলে তা দেশীয় উৎপাদকদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ থেকে আমদানির দিকে ঝুঁকেছে। জাতীয় এপিআই নীতি বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের স্বার্থে ইডিসিএলকে আবার দেশীয় উৎসে ফিরতে হবে।

এ বিষয়ে ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামালের তুলনায় কম দামে কেনা যায়। সে কারণেই বিদেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

উৎপাদনকারীদের অভিযোগ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সম্প্রতি একাধিক প্রতিষ্ঠানকে প্যারাসিটামল আমদানির অনুমতি দিয়েছে, যা জাতীয় এপিআই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, দেশীয় কাঁচামালের দাম আমদানি করা কাঁচামালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হলেও জাতীয় স্বার্থে দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বিকল্প নেই। তা না হলে দেশে কখনোই পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই এপিআই শিল্প গড়ে উঠবে না।

গণস্বাস্থ্য বেসিক কেমিক্যাল লিমিটেডের কর্মকর্তা এম জামাল উদ্দিন বলেন, দেশে ব্যবহৃত ওষুধের প্রায় ৯৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও কাঁচামালের প্রায় ৯৫ শতাংশ এখনও আমদানিনির্ভর। ২০১৮ সালে প্রণীত এপিআই নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেসব কাঁচামাল দেশে উৎপাদন সম্ভব এবং চাহিদা পূরণে সক্ষম, সেগুলো আমদানি করা যাবে না। এই নীতির তোয়াক্কা না করে প্যারাসিটামল আমদানি চলতে থাকলে তা স্বাস্থ্য খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। তিনি দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদনে প্রণোদনা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে আমদানি নিরুৎসাহিত করার আহ্বান জানান।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত নভেম্বরে প্যারাসিটামল আমদানি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে একটি বৈঠক হয়েছে এবং সে অনুযায়ী একটি মিটিং নোট প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতে গেলে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। প্রথম দিকে প্যারাসিটামল আমদানি নিয়ন্ত্রণের ভাবনা সংস্থাটির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দেশের ওষুধ শিল্পকে কৌশলগতভাবে রূপান্তর এবং জাতীয় স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে এপিআই নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। দেশে এখন প্রায় সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন সম্ভব হলেও এপিআইয়ের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেই জাতীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। করোনাকালে এই দুর্বলতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এপিআই, ভ্যাকসিন, আইভিডি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে দ্রুত দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রণোদনা দেওয়া এবং উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের পর ধাপে ধাপে আমদানি সীমিত করা প্রয়োজন। ৭ ডিসেম্বর তিনি এপিআই নীতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়ে বিষয়টিকে ‘জাতীয় স্বার্থে শীর্ষ অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচনার অনুরোধ জানান।

এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার বলেন, দেশে ওষুধ কাঁচামাল শিল্পের বিকাশে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। এপিআই শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।